আ মরি বাংলা ভাষা, নিউজস্কোপ-এর বিশেষ নিবেদন
তপোব্রত ঘোষ
ভাষা দিবসের প্রাক্কালে শান্তিনিকেতন যেন এক বিশেষ নীরব সৌন্দর্যে সেজে ওঠে। শিমুল-পলাশের আগুনরঙা ছায়ায়, কাঁকরবিছানো পথে, আশ্রমিক প্রার্থনার সুরে জেগে থাকে এক গভীর আত্মচেতনা বাংলা ভাষার চেতনা। এখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি সংস্কৃতি, মনন ও আত্মপরিচয়ের অক্ষর বয়ে আনা রূপ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন এক শিক্ষাদর্শে, যেখানে মাতৃভাষা হবে ভাবনার প্রধান আশ্রয়। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ—“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে”শুধু দেশপ্রেম নয়, ভাষাপ্রেমেরও এক অনিবার্য প্রকাশ। আবার ‘সভ্যতার সংকট’-এ তিনি লিখেছিলেন, মানুষকে নিজের শিকড়ের উপর দাঁড়িয়ে বিশ্বকে গ্রহণ করতে হবে। সেই শিকড়ের প্রথম পরিচয় মাতৃভাষা।
ভাষা দিবসের প্রাক্কালে বিশ্বভারতী-র প্রাঙ্গণে তাই বাংলা বর্ণমালার আলপনা আঁকা হয়, আবৃত্তির মঞ্চে ধ্বনিত হয় কবিতা, রবীন্দ্রসঙ্গীতে মিশে যায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
শিক্ষার্থী ঐশ্বর্য পাল জানায়, “আমরা যখন খোলা আকাশের নিচে পাঠ নিই, তখন মনে হয় ভাষাটা বইয়ের পাতায় আটকে নেই—সে বাতাসে ভাসছে ” তার কথায় স্পষ্ট, শান্তিনিকেতনে বাংলা এক চলমান অভিজ্ঞতা।
বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন
“আমি চিরবিদ্রোহী বীর”এই বিদ্রোহ কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নয়, আত্মবিস্মৃতির বিরুদ্ধেও। মাতৃভাষাকে অস্বীকার করা মানে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এই বোধ শান্তিনিকেতনের শিক্ষাদর্শে অন্তর্নিহিত। আবার জীবনানন্দ দাশ-এর কাব্যে যে বাংলার প্রকৃতি ও মাটির ঘ্রাণ, তা যেন এখানে বাস্তব হয়ে ওঠে“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।” এই পংক্তি শান্তিনিকেতনের আকাশের নিচে যেন নতুন তাৎপর্য পায়।
এখানে বিশ্বজনীনতার পাঠও বাংলা ভাষার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। বিদেশি ছাত্রছাত্রীরাও বাংলা উচ্চারণে চেষ্টা করে, রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখে, কবিতা আবৃত্তি করে। যেন প্রমাণ করে, ভাষা যত আপন, ততই তা বিশ্বমুখী হতে পারে।
ভাষা দিবসের সকালে প্রার্থনামঞ্চে যখন একসঙ্গে উচ্চারিত হয়“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”তখন বোঝা যায়, শান্তিনিকেতনে বাংলা কোনো স্মৃতির স্মারক নয়; এটি জীবন্ত, স্পন্দিত, প্রতিদিনের চর্চিত সত্য।
রবীন্দ্রনাথ যে স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের ভাষায় বিশ্বকে জানা এবং নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান করে মানবতার দিকে এগিয়ে যাওয়া শান্তিনিকেতন আজও সেই স্বপ্ন লালন করে চলেছে। ভাষা দিবসের প্রাক্কালে তাই এই আশ্রমভূমি কেবল সেজে ওঠে না; সে নিজেকে নতুন করে চিনে নেয় বাংলার আলোয়, রবীন্দ্র-মননের গভীর, নান্দনিক দীপ্তিতে।

