আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এর রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ চড়ছে। এরই মাঝে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিলেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। শুক্রবার তিনি এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে একটি কড়া চিঠি দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও পদ্ধতিগত নিয়মকানুন সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না।
গণতান্ত্রিক দেশ ভারত (India)-এ নির্বাচনই হল সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আর সেই নির্বাচনের মূল ভিত্তি হল একটি ত্রুটিমুক্ত এবং স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। কিন্তু সেই তালিকাতেই যদি গলদ থাকে, তবে তা সরাসরি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করে। চিঠিতে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
প্রথমত, চিঠিতে বলা হয়েছে যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু, প্রতিদিন যে সাপ্লিমেন্টারি বা পরিপূরক ভোটার তালিকা তৈরি হচ্ছে, সেগুলিও যে এই চূড়ান্ত ভোটার তালিকারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হবে, সেই বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি। এই ধোঁয়াশার কারণে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলিও যথেষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে, প্রতিদিনের পরিপূরক ভোটার তালিকা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে, যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং ভোটাররা তাঁদের দাবির বর্তমান অবস্থা জানতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, নির্বাচন কমিশন সেই নির্দেশ সঠিকভাবে পালন করছে না। বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পোর্টাল থাকলেও, সাধারণ মানুষের জন্য কোনো তথ্য সর্বজনীন করা হচ্ছে না। এই পদ্ধতিগত অস্বচ্ছতা শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরিপন্থী বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, ভোটার তালিকা থেকে কোনো ব্যক্তির নাম বাদ পড়লে বা বাতিল হলে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হচ্ছে না। কোনো নাগরিকের নাম কেন বাদ গেল, তার সঠিক কারণ লিখিতভাবে না জানালে, সেই ব্যক্তি আইনি সাহায্য নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে একজন নাগরিককে তাঁর ভোটাধিকার থেকে এভাবে কারণ না দর্শিয়ে বঞ্চিত করা যায় না।
দলের দাবি ও আগামী পদক্ষেপ
এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরে জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের তরফ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে দ্রুত সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রতিদিনের পরিপূরক তালিকাগুলিকে চূড়ান্ত তালিকার অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঘোষণা করা।
- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে প্রতিদিনের তালিকা প্রকাশ নিশ্চিত করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করা।
- নাম বাতিলের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্তগুলিকে স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা।
দলীয় নেতৃত্বের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করতে তাঁদের এই লড়াই আগামী দিনেও নিরলসভাবে চলবে। নয়াদিল্লি (New Delhi)-তে নির্বাচন সদনে পাঠানো এই চিঠি আদতে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বাড়ানোর এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থার উপর সাধারণ মানুষের অগাধ আস্থা থাকে। যখন সেই সংস্থার কার্যপ্রণালী নিয়েই রাজ্যের শাসক দলের একজন শীর্ষ নেতা এমন গুরুতর অভিযোগ তোলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তা রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতির একটি অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলই চাইছে নির্বাচনের আগেই সমস্ত পদ্ধতিগত ত্রুটি দূর করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে।
বিশেষ করে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে আমরা দেখেছি, ভোটের দিন বুথে গিয়ে অনেক সাধারণ ভোটার জানতে পারেন যে তাঁদের নাম তালিকায় নেই। এই ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতেই আগেভাগে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করে দেওয়া হল। এখন যদি দ্রুত এই সমস্যাগুলির সমাধান না করা হয়, তবে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের পথেও হাঁটতে পারে রাজ্যের শাসক দল।
