back to top
Sunday, April 12, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
Homeসম্পাদকীয়ভোটের সার্কাস ও নেতাদের 'আমআদমি' সাজার প্রতিযোগিতা

ভোটের সার্কাস ও নেতাদের ‘আমআদমি’ সাজার প্রতিযোগিতা

ক্যামেরার সামনে রুটি বেলা থেকে মাঠে লাঙল দেওয়া— ভোটের আগে নেতাদের 'মাটির মানুষ' সাজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাংলার রূঢ় বাস্তব এবং সস্তা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট

বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর দামামা বেজে গিয়েছে। আর নির্বাচন এলেই বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শুরু হয়ে যায় এক অদ্ভুত এবং প্রায়শই দৃষ্টিকটু খোলনলচে বদলানোর পালা। সারা বছর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি, নিরাপত্তারক্ষীর ঘেরাটোপ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত নেতা-নেত্রীরা ভোট এলেই হঠাৎ করে মিশে যেতে চান ধুলোমাখা বাস্তবের সঙ্গে। কেউ সটান ঢুকে পড়ছেন সাধারণ গৃহস্থের রান্নাঘরে, কেউ ক্ষুর-কাঁচি হাতে অবতীর্ণ হচ্ছেন নরসুন্দরের ভূমিকায়, আবার কেউ কাদা মেখে লাঙল দিচ্ছেন চাষের জমিতে। জনসংযোগের নামে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির নিখুঁত চিত্রনাট্য মেনে এই যে ‘শোম্যানশিপ’ বা লোকদেখানো অভিনয় চলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে তা মুহূর্তে ভাইরালও হচ্ছে। কিন্তু ক্যামেরার ফ্ল্যাশ নিভে যাওয়ার পর, একজন সাধারণ খেটে-খাওয়া নাগরিকের প্রতিদিনের জীবনযাপনে এই সাময়িক নাটকের আসল অর্থ ঠিক কতটা? গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, নেতাদের এই ‘মাটির মানুষ’ সাজার নির্লজ্জ প্রয়াস আসলে আমজনতার প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য এবং অসহায়তাকে চরমভাবে উপহাস করারই শামিল।

রান্নাবাটি খেলা বনাম মূল্যবৃদ্ধির ছ্যাঁকা

ভোটের বাজারে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য হলো গৃহস্থের রান্নাঘর। নেতারা মনে করেন, উনুনের পাশে বসে দু’দণ্ড হাসিমুখে ছবি তুললেই বুঝি গৃহবধূদের মন জয় করা যায়।

উদাহরণস্বরূপ, পুরশুড়ার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী পার্থ হাজারীর কথাই ধরা যাক। প্রচারের ফাঁকে তিনি সটান ঢুকে পড়লেন এক ভোটারের হেঁশেলে, বসে পড়লেন মাটির উনুনের পাশে এবং নিজের হাতে রুটি বেলতে শুরু করলেন। তাঁর দাবি, রান্নার গ্যাসের আকাল এবং চরম মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানাতেই তাঁর এই পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একবেলা ক্যামেরার সামনে রুটি বেলে দিলেই কি সেই পরিবারের প্রতিদিনের উনুন জ্বালানোর কষ্ট লাঘব হয়? কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সমালোচনা করাটা রাজনৈতিক অধিকার, কিন্তু রাজ্যের শাসক দলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কি জানেন না যে, হাজার হাজার পরিবার আজও বাধ্য হয়ে কাঠের জালে রান্না করছে কারণ তাদের গ্যাসে ভর্তুকি জোটে না বা সিলিন্ডার কেনার আর্থিক সামর্থ্য নেই?

অন্যদিকে, আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পাল এক সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে তেলে ভাজা বা পকোড়া ভাজতে শুরু করলেন। তাঁর এই কাজের উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পূর্ববর্তী একটি মন্তব্যের (পকোড়া ভেজে শিল্প করার) প্রতি কটাক্ষ করা। রাজ্যের কর্মসংস্থানহীনতা এবং শিল্পখরা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিরোধীদের কাজ। কিন্তু আসানসোলের মতো এককালের শিল্পাঞ্চলে, যেখানে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যুবসমাজ আজ ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পকোড়া ভাজার এই ‘ফোটো-অপ’ কি সেই বেকার যুবকদের হতাশার প্রতি এক নির্মম রসিকতা নয়?

একইভাবে, বলাগড়ের তৃণমূল প্রার্থী রঞ্জন ধারা প্রচারের পথ পরিবর্তন করে সোজা এক প্রতিবেশীর রান্নাঘরে ঢুকে রান্না শুরু করে দিলেন। আবার রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী শুভজিৎ দাশগুপ্তকে দেখা গেল এক সাধারণ গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকে সটান মোচা কাটতে। বাংলার হেঁশেলের অত্যন্ত পরিচিত এই আনাজ কাটার মধ্যে দিয়ে তিনি হয়তো বোঝাতে চাইলেন যে তিনিও খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্ম। আরামবাগের তৃণমূল প্রার্থী মিতা বাগ আরও একধাপ এগিয়ে ঘুঁটে দিলেন, রান্না করলেন এবং এক ৮০ বছরের বৃদ্ধা ভোটারকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলেও নিলেন।

আরো পড়ুন:  Assembly Election 2026: ‘উস্কানিমূলক মন্তব্য’, মমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিজেপি-র স্মারকলিপি

এই প্রতিটি ঘটনার গভীরে লুকিয়ে আছে এক চরম অমানবিকতা। একজন সাধারণ দিনমজুর বা গৃহবধূর কাছে রান্না করা, মোচা কাটা বা ঘুঁটে দেওয়া কোনো পিকনিক বা রোমান্টিক ক্যামেরার ফ্রেম নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার হাড়ভাঙা খাটুনির একটা অংশ। যখন বাজারে ডাল, তেল, সবজির দাম আকাশছোঁয়া, যখন মাসের শেষে ছেলেমেয়েদের মুখে দু’মুঠো পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে বাবা-মাকে কালঘাম ছুটতে হয়, তখন নেতাদের এই একদিনের ‘সাহায্য’ স্রেফ একটি প্রহসন। মাটির বাড়িতে বসে একবেলা পাত পেড়ে খেলেই দারিদ্র্য ঘোচে না। সাধারণ মানুষ চান খাদ্যনিরাপত্তা এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, নেতাদের এই ‘মাস্টারশেফ’ হওয়ার অভিনয় নয়।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপ বনাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্টেথোস্কোপের নাটক

সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং বীভৎস দ্বিচারিতার চিত্রটি ফুটে উঠেছে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে। গোঘাটের তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের অন্যতম পরিচিত চিকিৎসক নেতা নির্মল মাজি প্রচারের ফাঁকে এক গ্রামবাসীর মাটির বাড়িতে ঢুকে রান্নায় সাহায্য করলেন এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অভিনয় করলেন। শাসক দলের একজন প্রথম সারির চিকিৎসক নেতার এই ‘দরদী’ রূপ দেখে সাধারণ মানুষের মুগ্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত বাস্তবটা ঠিক কীরকম?

যখন শ্রী মাজি গ্রামের রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিখুঁত চিত্রনাট্য মেনে রোগীর নাড়ি টিপছেন, ঠিক সেই সময়েই রাজ্যের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল, কলকাতার বুকে অবস্থিত আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজে ঘটে গিয়েছে পরপর দুটি অমানবিক, মর্মান্তিক এবং শিউরে ওঠার মতো মৃত্যুর ঘটনা, যা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর কঙ্কালসার এবং পচনশীল চেহারাটাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে দিয়েছে।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ২০শে মার্চ, ২০২৬ তারিখে। অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় নামক ৪১ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তাঁর চার বছরের সন্তানের ভাঙা হাতের চিকিৎসা করাতে এসে হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মর্মান্তিকভাবে আটকে পড়েন এবং পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান। তদন্তে উঠে আসে এক ভয়ঙ্কর তথ্য—সেদিন রাতে ওই লিফটের দায়িত্বে থাকা তিন অপারেটরই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁদের এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ কাজের কোনো ন্যূনতম পূর্বপ্রশিক্ষণও ছিল না।

এই চরম প্রশাসনিক গাফিলতির রেশ কাটতে না কাটতেই, মাত্র তিনদিনের মাথায় ২৩শে মার্চ ঘটে যায় আরও এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। উত্তর ২৪ পরগনার বিশপুকুরের বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী বিশ্বজিৎ সামন্ত শ্বাসকষ্ট এবং নাক থেকে রক্তপাতের সমস্যা নিয়ে ওই একই হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ইউনিটে ভর্তি হন। ভোরবেলায় তাঁর শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হলে, তাঁর পরিবারকে জানানো হয় যে ইমার্জেন্সি বিভাগে রোগীদের জন্য কোনো শৌচাগার ব্যবহারযোগ্য নয় (সেটি সংস্কারের জন্য তালাবন্ধ)। ফলস্বরূপ, ওই গুরুতর অসুস্থ হৃদরোগীকে স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ার ছাড়াই প্রায় ৪০-৫০ মিটার হেঁটে এবং ২৪টি সিঁড়ি ভেঙে দোতলার একটি পে-অ্যান্ড-ইউজ শৌচাগারে যেতে বাধ্য করা হয়। একজন মুমূর্ষু রোগীর পক্ষে এই চরম শারীরিক ধকল সহ্য করা অসম্ভব ছিল। শৌচাগারের দরজাতেই ছেলের কোলে লুটিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় তাঁর।

যে রাজ্যের খোদ রাজধানীতে, একটি প্রথম সারির মেডিক্যাল কলেজে মুমূর্ষু রোগীকে শৌচাগারে যাওয়ার জন্য হেঁটে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয়, বিনা রক্ষণাবেক্ষণে থাকা লিফটে মদ্যপ কর্মীদের গাফিলতিতে পিষ্ট হয়ে রোগীর আত্মীয়কে মরতে হয়, এবং ন্যূনতম একটি স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ার জোটে না, সেই রাজ্যের শাসক দলের একজন চিকিৎসক বিধায়ক যখন ভোটের আগে গ্রামের রাস্তায় নেমে স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার সস্তা নাটক করেন, তখন তা সাধারণ মানুষের চরম অসহায়তার প্রতি এক নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ এবং অমানবিক উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে নাড়ি টেপা চান না, মানুষ চান হাসপাতালে গেলে ন্যূনতম বেঁচে ফেরার গ্যারান্টিটুকু।

আরো পড়ুন:  SIR: এসআইআর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সিইও অফিসে বড় বৈঠক

কাস্তে-লাঙল হাতে বাবুদের ‘কৃষক-প্রেম’: কাদার দাগে কি ঋণের বোঝা কমে?

কৃষিপ্রধান বাংলায় কৃষকদের মন জয় করা সব রাজনৈতিক দলেরই প্রাথমিক লক্ষ্য। কিন্তু কৃষকের আসল সমস্যার সমাধান করার বদলে মাঠে নেমে ছবি তোলার যে হিড়িক পড়েছে, তা রীতিমতো হাস্যকর।

পুরশুড়ার বিদায়ী বিধায়ক তথা এবারের বিজেপি প্রার্থী বিমান ঘোষ গ্রামীণ ভোটারদের সঙ্গে নিজের “যোগাযোগ” প্রমাণ করতে সটান মাঠে নেমে লাঙল চালাতে শুরু করলেন। মালদহের বিজেপি প্রার্থী গোপাল চন্দ্র সাহাকে দেখা গেল কৃষকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠ থেকে আলু তুলতে। গোঘাটের বিজেপি প্রার্থী প্রশান্ত দিগারও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলুর ফলন তোলার কাজে হাত লাগালেন।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি থেকে নেমে, দামি জামাকাপড় গুটিয়ে দশ মিনিটের জন্য কাদা মাখা আর রোদে পোড়াটা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক কুড়োনোর জন্য দারুণ উপাদান হতে পারে। কিন্তু এই বাবুরা কি জানেন, বীজতলায় জল না পেলে কৃষকের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে? তাঁরা কি জানেন, সারের কালোবাজারি, সেচের জলের অভাব এবং মহাজনের ঋণের চাপে পড়ে যখন একজন কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তখন তাঁর পরিবারের ওপর কী অন্ধকার নেমে আসে? আলু তুলতে সাহায্য করা নেতাদের কি জানা আছে যে, হিমঘরের অভাবে এবং ফড়েদের দাপটে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে এই কৃষকেরাই রাস্তায় আলু ফেলে বিক্ষোভ দেখাতে বাধ্য হন? কৃষকের ফসলের সঠিক সহায়ক মূল্য (MSP) নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট নীতি নির্ধারণ না করে, স্রেফ একদিন মাঠে নেমে কাদা মাখলেই কৃষকের বন্ধু হওয়া যায় না। এটি কৃষকের হাড়ভাঙা শ্রম এবং ঘামকে অবমাননা করার নামান্তর।

পেশার অভিনয় বনাম শ্রমিকের হাহাকার

জনসংযোগের নামে বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজ নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটা অদ্ভুত ট্রেন্ড এবার দেখা যাচ্ছে।

দুবরাজপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা বিজেপি প্রার্থী অনুপ কুমার সাহা তাঁর প্রচারের মাঝে একটি সেলুনে ঢুকে নিজে ক্ষুর হাতে নিয়ে এক ক্রেতার দাড়ি কামিয়ে দিলেন। তিনি বোঝাতে চাইলেন যে তিনি “মাটির মানুষ”। কিন্তু একজন নরসুন্দর, যিনি প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অন্যের চুল-দাড়ি কাটেন শুধুমাত্র নিজের সংসারটা কোনোমতে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য, তাঁর পেশাকে এভাবে প্রচারের আলোয় ব্যবহার করা কতটা যুক্তিযুক্ত? অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই শ্রমিকদের না আছে কোনো স্বাস্থ্যবিমা, না আছে ভবিষ্যতের কোনো আর্থিক নিরাপত্তা। তাঁদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সরকারি প্রকল্প বা সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি না করে, তাঁদের পেশা নিয়ে একদিনের এই ‘ফোটো-শুট’ আসলে তাঁদের দারিদ্র্যকে রোমান্টিসাইজ করার একটি নগ্ন প্রচেষ্টা।

আরো পড়ুন:  Assam Assembly Election 2026: জালুকবাড়ি থেকে লড়ছেন হিমন্ত, দিসপুর থেকে প্রার্থী প্রদ্যুৎ

চমক, স্টান্ট এবং ধর্মীয় ভাবাবেগ

ভোটের প্রচারকে রীতিমতো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং সার্কাসে পরিণত করেছেন প্রার্থীরা। বিধাননগরের বিজেপি প্রার্থী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় হাতে একটি আস্ত কাঁচা মাছ নিয়ে প্রচারে বেরোলেন। উদ্দেশ্য, রাজ্যের শাসক দলের সেই অভিযোগ খণ্ডন করা যেখানে বলা হয়েছিল বিজেপি ক্ষমতায় এলে আমিষ খাদ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপাবে। সাধারণ মানুষের পুষ্টি, খাদ্যের অধিকার এবং কর্মসংস্থানের মতো জ্বলন্ত বিষয়গুলিকে দূরে সরিয়ে রেখে, কে কী খাবে এবং তার ভিত্তিতে ভোট চাওয়ার এই রাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত।

দুবরাজপুরের তৃণমূল প্রার্থী নরেশ চন্দ্র বাউড়ি ইদের দিন চোখ বেঁধে ‘হাঁড়ি ফাটানো’ খেলায় মেতে উঠলেন। কেশিয়ারির তৃণমূল প্রার্থী রামজীবন মান্ডি জনসভায় পৌঁছনোর জন্য টানা ১২ কিলোমিটার পথ দৌড়লেন। নারায়ণগড়ের তৃণমূল প্রার্থী প্রতিভা রানী মাইতি চারচাকা ছেড়ে সাইকেলে চেপে গ্রামে গ্রামে ঘুরলেন। অন্যদিকে গোপীবল্লভপুরের বিজেপি প্রার্থী রাজেশ মাহাতো চিরাচরিত রাজনৈতিক ভাষণের বদলে আবির মেখে, খোল-করতাল বাজিয়ে কীর্তনের সুরে প্রচার সারলেন।

এই প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, রাজনীতি আজ আর নীতি, আদর্শ বা উন্নয়নের ব্লু-প্রিন্টের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। দৌড়ে স্ট্যামিনা দেখানো মানেই যে তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক হবেন, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সাইকেলে ঘোরাটা সাময়িক চমক হতে পারে, কিন্তু সেই গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট এবং বেহাল পরিবহন ব্যবস্থার দায় কে নেবে? আর ধর্মের মোড়কে রাজনীতিকে মুড়িয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা, তা সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির আসল প্রশ্নগুলো থেকে চোখ ঘুরিয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।

মানুষ কী চান?

গণতন্ত্রে প্রার্থীর সঙ্গে মানুষের নিবিড় সংযোগ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যখন সেই জনসংযোগ একটি পিআর এজেন্সির তৈরি করা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী ক্যামেরার সামনে অভিনীত হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সংগ্রামকে চরমভাবে ছোট করে দেখায়।

বাংলার সাধারণ মানুষ, যাঁরা প্রতিদিন লোকাল ট্রেনের বাদুড়ঝোলা ভিড়ে ঘাম ঝরান, যাঁরা রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে চাল-গমের হিসাব কষেন, যাঁরা হাসপাতালের মেঝেতে মুমূর্ষু পরিজনের পাশে বসে রাত জাগেন— তাঁরা জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে এই জাদুকরী চমক বা ‘রিয়েলিটি শো’ আশা করেন না। তাঁরা চান সুস্পষ্ট নীতি, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সংবেদনশীলতা। তাঁরা এমন প্রতিনিধি চান যিনি নির্বাচনের পর পাঁচ বছর নিরুদ্দেশ হয়ে যাবেন না, যিনি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তাঁদের অধিকারের পক্ষে সরব হবেন।

ভোটের আগে এই সাধারণ মানুষ সাজার যে প্রতিযোগিতা চলছে, তা রাজ্যের সচেতন নাগরিকদের কাছে এখন অত্যন্ত পরিষ্কার। নেতারা যতই রুটি বেলুন, দাড়ি কাটুন বা লাঙল চালান না কেন, সাধারণ মানুষ জানেন যে এই সবকিছুর উদ্দেশ্য একটাই— ক্ষমতা দখল। আমজনতার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কাছে এই নির্বাচনী শোম্যানশিপ সম্পূর্ণ অর্থহীন, মূল্যহীন এবং এক চরম প্রহসন। অধিকার বুঝে নেওয়ার এই কঠিন লড়াইয়ে, বাংলার মানুষের কাছে এখন ফোটোশুটের নাটকের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো কাজের বাস্তব খতিয়ান এবং প্রতিশ্রুতির যথাযথ রূপায়ণ। নাগরিকের এই সচেতনতাই পারে ভোট-রাজনীতির এই সস্তা স্টান্টবাজিকে যোগ্য জবাব দিতে।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments