কমল সেনগুপ্ত (বাংলাদেশ)
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুঞ্জেরহাট, দক্ষিণ টকবি ইউনিয়নের মুলাইপত্তন গ্রামে তখন গভীর রাত। ছায়াঘেরা বাংলার সেই চিরচেনা রূপ, রাত নামলে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর গাছের পাতার মরমর শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না এই গ্রামে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে কানে ভেসে এলো অতি পরিচিত সুর, “রাধারমণ বলে শোনরে কালিয়া নিভা ছিলো মনের আগুন কে দিলা জ্বালাইয়ারে,…”।

ঘুমের ঘোর কাটিয়ে বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই, এক মায়াবী জগতের মুখোমুখি হলাম। একদল মানুষ, কারও কাঁধে ঢোল, কারও কাঁধে সযত্নে বাঁধা হারমোনিয়াম, কেউ বাজাচ্ছেন করতাল, আর কারও ঠোঁটে বিলাপের করুণ সুর তুলছে কর্নেট বাঁশি। গেরুয়া রঙের পোশাকে খালি পায়ে ধুলোমাখা আঙিনায় দাঁড়িয়ে তারা গান গাইছেন, আধ্যাত্মিক সুরে, উদাস হয়ে গেলাম, প্রবেশ করলাম অতীন্দ্রিয় জগতে। জানলাম ওরা সন্ন্যাসী, তবে কেউই গৃহত্যাগী নয়, ‘পক্ষকালের সন্ন্যাসী’।

এ অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে প্রতি বছর চৈত্র মাসের ১৫ তারিখের পর পক্ষকাল সন্ন্যাস ব্রত পালন করেন তারা। তারা নিজ গোত্র ত্যাগ করে সন্ন্যাস ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে কৃচ্ছসাধনের জীবন-যাপন করেন। ৮/১০ জন লোক নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়। একাধিক দল থাকে এলাকায়, কারো পরনে গেরুয়া, কারো লাল, কারো বা কমলা কারো নীল ধুতি, ফতুয়া সাথে উত্তরীয়।

দলে থাকে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, বিত্তবান থেকে নিম্নবিত্ত, সবাই সংসারত্যাগী হন। প্রতিটি দল ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সকাল থেকে মাঝ রাত পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে (মূলতঃ হিন্দুদের) বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পরিবেশন করে নানান লোকজ গান। এ গানের কথায় ও সুরে থাকে ত্যাগের বানী । গৃহস্থরা চাল, ডাল, টাকা পয়সা দান করেন। সন্ন্যাসীদের ভাষায়, তারা ভিক্ষা গ্রহণ করেন তবে কোন প্রত্যাশা থাকে না। জানা গেল সকাল থেকে সারা দিন এভাবে ঘুরে রাতে এক বাড়িতে নিরামিষ আহার করেন তারা।

গ্রামের বিত্তবানরা এদের রাতে নিরামিষ আহারের ব্যবস্থা করেন যা প্রতিদিন আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। রাতে এক জায়গায় বিশ্রাম করেন তারা। সন্ন্যাস জীবনে তাদের ঘর-সংসারের সাথে কোন যোগাযোগ থাকে না। এমনকি এই ব্রত পালনকালে কেউ মৃত্যুবরণ করলে দলের সাথীরাই মৃতদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। পরিবারের স্বজনরা তার মৃতদেহ স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেন না।

চৈত্র মাসের সংক্রান্তির একদিন আগে, প্রতিটি দল ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনে মহাদেবের পূজা করেন। ব্রত শেষে নববর্ষে তারা নতুন স্বপ্ন বুনে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। এ আয়োজন এখন শুধু হিন্দুদেরই নয় সহায়তা করেন সব ধর্মের মানুষ। সহানুভূতি জানান অন্যান্য ধর্মের বন্ধুরাও। জানা গেল এ আয়োজন, জেলার এলাকার সর্বত্র হয়ে থাকে।

জনশ্রুতি আছে, এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ দম্পতি বারবার সন্তান হারিয়ে শোকাতুর হৃদয়ে যখন কাশীতে গঙ্গার তীরে মুক্তির পথ খুঁজছিলেন, ঠিক তখনই এক অলৌকিক বৃদ্ধার দেখা পান। সেই বৃদ্ধা তাদের চৈত্র মাসে সন্ন্যাস ব্রত পালন এবং সংক্রান্তির আগের দিন উপবাস থেকে নিষ্ঠার সাথে শিবপূজার নির্দেশ দেন। বিশ্বাস করা হয়, সেই ত্যাগের মহিমা আর দৈব আশীর্বাদ থেকেই জন্ম জন্মান্তরের শোক মুছে নিতে বাংলার এই প্রান্তে শুরু হয় নীলপূজা। হয়ত কাশী থেকে গঙ্গার সেই ঢেউ পদ্মা পাড় হয়ে, আছড়ে পড়েছে মেঘনার পাড়ে, কালের পরিক্রমায় হয়েছে ভোলায় এসেছে ‘ক্ষণিক সন্ন্যাস’ ব্রত পালনে এ লোকজ ঐতিহ্য। একটি সন্ন্যাস দলের প্রধান অদ্বৈত চন্দ্র দে বলেন, ‘সন্ন্যাস ব্রত আমাদের এলাকায় বংশ পরম্পরায় পালিত হয়ে আসছে’।

অদূরে শম্ভুপুর, অনীল সাধুর পুণ্যভূমি, এখান থেকে সন্ধ্যারতির সময় শঙ্খধ্বনি শোনা যায়। এখানে ডমরুর তালে যে স্তোত্র পাঠ করা হয়, তাতে ত্যাগের সুর আছে, যা হাজার বছর ধরে এ দ্বীপের পথে পথে ছড়িয়ে আছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন মহাদেবের পূজার মধ্য দিয়ে এই কৃচ্ছ্রসাধনের সমাপ্তি ঘটে।

পহেলা বৈশাখের নতুন ভোরে তারা আবার ফিরে যান তাদের চেনা সংসারে, পুরোনো আপনজনদের কাছে। তবে সঙ্গে নিয়ে আসেন এক প্রশান্ত মন আর ত্যাগের মহিমা। স্কুল শিক্ষক রাজীব চন্দ্র দেও জানান, ’এ অঞ্চলে শিবের আরাধনা প্রভাব লক্ষ্য করা যায় লোকসংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে, চৈত্র মাসে শিব-গৌরীর নাচের চল রয়েছে, যেখানে ভক্তরা শিব ও পার্বতীর সজ্জায় সজ্জিত হয়ে পৌরাণিক আখ্যানকে ফুটিয়ে তোলে। বৈরাগী বা ত্যাগীদের প্রধান দেবতা হলেন ভগবান শিব। শিবকে আদি-বৈরাগী বা মহাযোগী হিসেবেও গণ্য করা হয়, যিনি জাগতিক আসক্তি, সুখ-দুঃখ এবং মায়া থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত’।

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের, শুক্লা দ্বাদশীর দিন বোষ্টুমীর সেই না শুনতে পারা ‘অন্তরাটুকু’ হয়তো এই সন্ন্যাসীদের সুরেই লুকিয়ে ছিল। সন্ন্যাসীদের বৈরাগ্য মাখানো সুর শুনতে শুনতে মনে হল, এই যে নীলকণ্ঠের চরণে নিজেকে সঁপে দেওয়া….এ কেবল আচার নয়, সেই চরম সত্য, যেখানে স্বার্থের বিসর্জনেই মানুষের অন্তরের দেবত্ব জাগ্রত হয়।


Recent Comments