back to top
Sunday, April 19, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
Homeসাহিত্য সংস্কৃতিবিজয় গুপ্তের ফুল্লশ্রী: একটি বিলুপ্ত উৎসবের কাহিনি

বিজয় গুপ্তের ফুল্লশ্রী: একটি বিলুপ্ত উৎসবের কাহিনি

কমল সেনগুপ্ত

বাংলাদেশের গৈলা-ফুল্লশ্রীতে একসময় ছিল হিন্দু সংস্কৃতির ঐতিহ্য। দিন বদলে গেছে। সেই ইতিহাস বিলুপ্ত। বাংলা নববর্ষে ‘চারুকলা’-র আয়োজনে বরিশাল শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বার হলেও ফুল্লশ্রী আজ কেবলই আঁকড়ে অতীতের নববর্ষের স্মৃতি নিয়ে।

হাতে হাতে রঙিন চীন কাগজের পতাকা, মুখে তারুণ্যের দৃপ্ত শ্লোগান, কীর্তনের সুর তালে এগিয়ে চলছে একটি বিশাল শোভাযাত্রা। ফুল্লশ্রী বাল্য আশ্রমের আঙিনা থেকে শুরু, স্মৃতির তর্পণে সিক্ত প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে গৈলা বিজয় গুপ্তের মনসা বাড়ির সেই শেকড়ের মোহনায় পরিসমাপ্তি।

আবালবৃদ্ধবনিতা, অশীতিপর বৃদ্ধ থেকে কোলঘেঁষা শিশুটিও শামিল হতেন ঐতিহ্যের ওই মিছিলে, প্রতি নববর্ষে, প্রাণের টানে। সেই প্রাণের টান, সেই মাটির মমতা আজ আর নেই। যান্ত্রিকতার এই চাদর সরিয়ে যখন চোখ বুজি, নববর্ষে সেই বর্ণিল শোভাযাত্রাটি আজও বুকের বাম পাশে হেঁটে চলে, অবিরাম-অবিরত।

গৈলা-ফুল্লশ্রী। যে গ্রামের মাটিতে ঐতিহ্য আছে, পাতায় পাতায় সংস্কৃতি আছে। সে জনপদে শতাধিক বছরের পুরনো বৈশাখী শোভাযাত্রার ইতিহাস আছে। সেই যে পাঁচশ বছর আগে কবি বিজয় গুপ্ত মনসা মঙ্গল কাব্যে লিখেছিলেন ‘স্থানগুণে যেই জন্মে সেই গুণময়, হেন ফুলশ্রী গ্রামে বসতি বিজয়।’ গৈলা ফুল্লশ্রীর মাটি ‘জ্ঞানী-গুণী আর বিপ্লবীর জন্মদাত্রী।

পহেলা বৈশাখের ভোরে রাঙামাটির পথ জেগে উঠত, জেগে উঠত মানুষ, মানুষের হৃদয়, বুক ভরা আবেগ। সবাই হাজির ফুল্লশ্রী বাল্য আশ্রমের খোলা মাঠে। হাতে পাটকাঠির মাথায় আঠা দিয়ে সাঁটা চীন কাগজের পতাকা, পালাকারের কাঁধে হারমোনিয়াম, খোল, করতাল আর কাঁসর ঘন্টার তালে তালে এঁকেবেঁকে ফুল্লশ্রীর বুক চিরে, এগিয়ে যেত শোভাযাত্রাটি।

গৌরনদী-আগৈলঝাড়ার পথ ধরে গৈলার পানে হেঁটে চলা সাড়ে তিন কিলোমিটার পথে ছিল প্রাণের স্পন্দন! কখনও গগনবিদারী শ্লোগান, কখনও দেশপ্রেমের, কখনো বা নতুনকে আবাহন করার। কীর্তনের সুর যেন মাটির বুক থেকে উঠে আসত। প্রথমে শত বছরের গৈলা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক সর্বত্যাগী কৈলাস চন্দ্র সেনের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। ত্যাগের সেই শীতল পরশ নিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ শহীদ তারকেশ্বর সেনগুপ্তের স্মৃতিস্তম্ভের দিকে, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ শেষে যখন বিজয় গুপ্তের স্মৃতিভিটায় দাঁড়াত,তখন মনে অদ্ভুত এক শিহরণ জেগে উঠত।

আরো পড়ুন:  বইচর্চা:- ডিজিটাল সাংবাদিকতা: পরিপ্রেক্ষিত ও পর্যালোচনা

খোল আর হারমোনিয়ামের প্রতিটি ঘায়ে হৃদয়ের সবটুকু আবেগে আর কীর্তনের চড়া সুরে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠত। মনে হতো,পদ্মপুরাণের সেই প্রাচীন পদগুলো যেন বৈশাখী হাওয়ায় ভেসে আসছে। এ আয়োজন কেবল ইতিহাসের পাতা উল্টানো নয়, এ ছিল সামাজিক বন্ধনের এক মহোৎসব।

মনসা মন্দির থেকে শোভাযাত্রা যেত গ্রামের গুণীজনদের বাড়ি্তে বাড়িতে। সে এক এলাহি কাণ্ড! কোনো বাড়িতে পা রাখতেই হাতে বড় বড় রসগোল্লা, কোথাও আবার রসে টইটম্বুর অমৃতের মতো অমৃতি, আর কোনো বাড়িতে ছানার সন্দেশ, গৈলা বাজারের এলেই মিষ্টির দোকানীরা মিষ্টির থালা নিয়ে এগিয়ে আসত হৃদয়ের ভালোবাসায়।

ফুল্লশ্রী গ্রামের আশি ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ পরেশ চন্দ্র তপাদার জানাল সেই আবেগময় স্মৃতি, ‘আহা! সেই রসগোল্লার স্বাদ যেন আজও মুখে লেগে আছে। সে কি উচ্ছ্বাস, সে কি আনন্দ! ’। তিনি জানান, ‘১৯৭১ সালে ১ বৈশাখ আমরা লাল বৃত্তের মাঝে সোনালী রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা নিয়ে শোভাযাত্রা করেছিলাম। সেবার শোভাযাত্রায় ছিল, শৃঙ্খল মুক্তির গান।

তিনি আরও জানান, ‘এ শোভাযাত্রার ইতিহাস শতাধিক বছরের, তবে নানা প্রতিকূলতায় গত ১০/১২ বছর আগে এ আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে’। দেবানন্দ দাস (৭০) জানান, ‘আগের দিন রাতে আমরা পাটকাঠির মাথায় আঠা দিয়ে চীন কাগজের ত্রিকোণ আকৃতির পতাকা লাগিয়ে রাখতাম। ভোর হতেই ২/৩ শ মানুষ হাজির হত শোভাযাত্রায় অংশ নিতে’।

তিনি জানান, ‘বাবার মুখেও এ শোভাযাত্রার কথা শুনেছি। নব্বইয়ের দশকের শেষলগ্নে সেই সোনালী জৌলুস ফিকে হতে শুরু করে’। শোভাযাত্রাটি যখন আবার ফুল্লশ্রীর পথ ধরত,তখন মাঝ আকাশে সূর্য উত্তাপ ছড়াত। ক্লান্তি ধুয়ে দিত বড় বড় রসগোল্লার স্বাদ, কে ক’টা খেয়েছে, এই আলোচনায়। সেই আবেগ আজ হয়তো সেলফির ভিড়ে হারিয়ে গেছে, কিন্তু স্মৃতির পাতায় তার রং আজও উজ্জ্বল। ফুল্লশ্রীর সেই বৈশাখী শোভাযাত্রা কেবল মিছিল ছিল না, ছিল শেকড়কে আগলে রাখা আমাদের আত্মপরিচয়ের স্পন্দন।

আরো পড়ুন:  বৈরাগ্যের অনলে মায়ার বিসর্জন: ভোলার পক্ষকাল সন্ন্যাস ব্রত

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, বরিশালের সাবেক সভাপতি গৈলা নিবাসী আশিস দাশগুপ্ত জানান, ‘আমার ছোট বেলা থেকেই এ আয়োজনটি আমি দেখেছি।’ যতটুকু জানা যায় ফুল্লশ্রীতেই লুকিয়ে আছে, এ অঞ্চলের বৈশাখী শোভাযাত্রার সব থেকে পুরনো ইতিহাস।

আজও বৈশাখ আসে। ফুল্লশ্রীর সেই মেঠোপথে আজ আর শোভাযাত্রা নামে না। চারদিকে শিকড় হারানোর যন্ত্রণা আর পারিবারিক ঐতিহ্যও হারানোর বেদনা। দেশভাগে সেকালের পালাকার ও মূল গায়েন ছন্তি সেনের ‘শেষ ঠিকানা’ হয়েছে হাজারীবাগে। তারপর মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়েছেন হালধরা দাদু, জ্যাঠামশাই এমনকি সেই প্রদীপ্ত প্রাণগুলো।

এরই ফাঁকে মায়ের কোলঘেঁষা সেই শিশুটির চুলেও পাক ধরেছে, দৃপ্ত তরুণের কালো চোখ ঘোলাটে হয়েছে, দেশান্তরের ধারাবাহিকতায় কেউবা সীমানা পেরিয়ে, খুঁজেছেন বাঁচার স্বপ্ন। ইতিমধ্যে সুর আর বে-সুরের লড়াইয়ে, হারিয়েছে আমাদের আজন্ম লালিত অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক মূল্যবোধ। ঠিক তেমনি, ফুল্লশ্রীর সেই চিরচেনা ‘ফুলের শোভা’ বিবর্ণ হচ্ছে বহুকাল আগে থেকেই।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সেই রিড-ভাঙা হারমোনিয়ামও আজ ধুলোবালির আস্তরণে ঢাকা, যার ‘ফুসফুস’ এখন পোকার দখলে। তবুও নিঝুম দুপুরে ধান ক্ষেতের ‘আইলে’, হিজল-তমালের মরমর ধ্বনিতে আজও শোনা যায় সেই হারানো ইতিহাসের হাহাকার, বুকের ভেতরটা শূন্যতায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ফুল্লশ্রীর সেই প্রাণের শোভাযাত্রা আজ স্মৃতির মণিকোঠায়।

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments