
ফিচার:তপোব্রত ঘোষ
ছবি গুগল
বাংলার বারো মাসের প্রতিটি তিথির অন্তরালে লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো গভীর বিশ্বাস বা স্বাস্থ্য সচেতনতা। মাঘ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিটি তেমনই এক অনন্য দিন, যা সাধারণের কাছে ‘শিলনোড়া ষষ্ঠী’ বা ‘গোটা সেদ্ধর দিন’ নামে পরিচিত। যান্ত্রিকতার এই যুগেও বাঙালির রান্নাঘরে এই দিনটি নিয়ে আসে এক ভিন্ন আমেজ।
নিয়ম ও আচারের সেতুবন্ধন
শিলনোড়া ষষ্ঠীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো উনুন ও শিলনোড়াকে বিশ্রাম দেওয়া। এদিন গৃহস্থের রান্নাঘরে আগুন জ্বলে না। প্রথা অনুযায়ী, সরস্বতী পূজার দিন রাতেই রান্নার যাবতীয় তোড়জোড় সেরে রাখা হয়। আলু, বেগুন, সিম, রাঙা আলু, কলাই ও মটরশুঁটি— মরসুমের সবজিগুলোকে একসঙ্গে দিয়ে তৈরি হয় ‘গোটা সেদ্ধ’। পরদিন সকালে অর্থাৎ ষষ্ঠীর তিথিতে সেই বাসি ও ঠান্ডা খাবার খাওয়ার নিয়ম। বাড়ির শিলনোড়াকে এদিন হলুদ কাপড়ে মুড়ে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে পুজো করা হয়। মায়েরা সন্তানের কবজিতে মঙ্গল কামনায় বেঁধে দেন হলুদ সুতো।
লোককথার অলৌকিক ছোঁয়া
এই ব্রতকে ঘিরে লোকমুখে এক মরমী গল্প প্রচলিত। বলা হয়, এক ব্রাহ্মণ পরিবারের সাত বধূ ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের হাহাকার দেখে দেবী ষষ্ঠী বৃদ্ধার বেশে এসে এই ব্রত পালনের পরামর্শ দেন। নিষ্ঠাভরে ব্রত করার পর তাঁদের কোল আলো করে সন্তান এলেও, এক শীতের সকালে শাশুড়ির জেদে নিয়ম ভেঙে গরম ভাত রান্না করা হয়। অবমাননার ফলে মুহূর্তেই সব আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়; বধূরা ও বাড়ির প্রিয় বিড়ালটি নিথর হয়ে পড়ে থাকে। অবশেষে দেবীর নির্দেশে পূজিত শিলের দই-হলুদের স্পর্শে ফিরে আসে সকলের প্রাণ। এই লোকগাথাই যুগে যুগে সাবধান করে দিয়েছে নিয়ম ও বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষায়।
ঋতু পরিবর্তন ও বিজ্ঞান
এই লোকাচারের পেছনে কেবল অলৌকিকতা নয়, লুকিয়ে আছে প্রাচীন স্বাস্থ্য সচেতনতাও। বসন্তের সন্ধিক্ষণে যখন পক্স বা বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ে, তখন এই ‘গোটা সেদ্ধ’ বা ঠান্ডা খাবার শরীরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। এটি আদতে এক প্রাচীন ডিটক্স প্রক্রিয়া।
শিলনোড়া ষষ্ঠী কেবল একটি পূজা নয়;
এটি প্রকৃতির পরিবর্তনকে মেনে নেওয়ার এবং পরিবারের সুরক্ষায় জননীদের চিরন্তন আর্তি। শত ব্যস্ততার মাঝেও বাঙালির এই সহজ-সরল জীবনবোধ আজও অমলিন।

