নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি বা NEP (National Education Policy) মেনে রাজ্যে চার বছরের স্নাতক ডিগ্রি কোর্স চালুর পর থেকেই একের পর এক জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। বিশেষ করে প্রথম পাঁচটি সেমেস্টারে (Semester) ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপক হারে ফেল করার ঘটনায় রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। এই নজিরবিহীন ‘ফেলের বন্যা’ সামাল দিতে এবং হাজার হাজার পড়ুয়ার শিক্ষাবর্ষ বাঁচানোর তাগিদে এবার ডিগ্রি কোর্সের মাঝপথেই নিজেদের তৈরি করা নিয়মে আমূল ঐতিহাসিক বদল আনতে বাধ্য হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Calcutta)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কাউন্সিলের (Under Graduate Council) সুপারিশ মেনে উপাচার্য আশুতোষ ঘোষ (Asutosh Ghosh) এবং পরীক্ষা নিয়ামক দফতর যৌথভাবে এই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ব্যাকলগ (Backlog) বা সাপ্লিমেন্টারি থাকা সত্ত্বেও এবার পড়ুয়ারা উচ্চতর সেমেস্টারে ভর্তি হতে পারবেন।
ঠিক কী ছিল পুরোনো নিয়ম?
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলিতে সিসিএফ বা কারিকুলাম অ্যান্ড ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক (Curriculum and Credit Framework) অনুযায়ী চার বছরের অনার্স কোর্স চালু হয়, তখন একটি কঠোর নিয়ম জারি করা হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী, কোনো পড়ুয়া যদি পঞ্চম সেমেস্টার পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় এবং প্রতিটি পেপারে (Minor and Major Papers) সফলভাবে পাশ না করেন, তবে তিনি কোনোভাবেই চতুর্থ বর্ষ অর্থাৎ সপ্তম সেমেস্টারে (7th Semester) ভর্তি হতে পারবেন না।
কিন্তু খাস কলকাতার বুক চিরে থাকা নামী-দামী কলেজগুলির বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের মাইনর বিষয়ের ফলাফল প্রকাশ পেতেই চোখ কপালে ওঠে শিক্ষা মহলের। দেখা যায়, প্রায় ৮১ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে নব্য শিক্ষানীতির আওতায় থাকা ৬১ হাজার পড়ুয়ার এক বিশাল অংশ তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম সেমেস্টারের মাইনর পেপারগুলিতে পাশই করতে পারেননি। নিয়ম মেনে চললে এদের একটা বড় অংশকে কলেজের মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হতো।
চাপের মুখে নতিস্বীকার, কী বদল এলো নিয়মে?
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কলকাতার বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষরা দফায় দফায় উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ামক বিভাগের কাছে দরবার করেন। তাঁরা দাবি তুলেছিলেন, ষষ্ঠ সেমেস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেই যেন ফেল করা পেপারগুলির জন্য বিশেষ সাপ্লিমেন্টারি (Supplementary Exam) পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই পথে না হেঁটে সরাসরি নিয়মের গেরো শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:
- পঞ্চম সেমেস্টার পর্যন্ত সব পেপারে পাশ না করলেও এখন থেকে পড়ুয়ারা সরাসরি সপ্তম সেমেস্টারে ভর্তি হতে পারবেন।
- ব্যাকলগ বা অনুত্তীর্ণ পেপার থাকলেও চতুর্থ বর্ষের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কোনো বাধা থাকবে না।
- একমাত্র শর্ত হলো, ওই ছাত্র বা ছাত্রীকে নিজের কলেজেই চতুর্থ বর্ষের পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করতে হবে।
বিভ্রান্তিতে বিজ্ঞানের মেধাবী পড়ুয়ারা, চরম ক্ষতি আইআইটি জ্যাম (JAM) সফলদের
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সাধারণ পড়ুয়ারা সাময়িক স্বস্তি পেলেও তীব্র ক্ষোভ ও আশঙ্কার মেঘ দানা বেঁধেছে কলেজের মেধাবী পড়ুয়াদের মনে। বিশেষ করে বিজ্ঞানের যে সমস্ত ছাত্রছাত্রী ইতিমধ্যেই আইআইটি (IIT) এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতকোত্তরে (Masters) ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘জ্যাম’ (Joint Admission Test for Masters)-এ সফল হয়েছেন, তাঁরা বড়সড় বিপাকে পড়েছেন।
বঙ্গবাসী কলেজের (Bangabasi College) ফিজিক্সের (Physics) এক প্রবীণ শিক্ষকের কথায়, “বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংশোধিত নিয়ম সর্বভারতীয় স্তরে খাটবে না। অন্যান্য কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা আইআইটি-তে তিন বছর পর স্নাতকোত্তরে ভর্তি হতে গেলে ষষ্ঠ সেমেস্টার পর্যন্ত সব বিষয়ে পাশ করা বাধ্যতামূলক। যেহেতু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাকলগ থাকা পড়ুয়াদের জন্য চটজলদি কোনো সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা নিচ্ছে না, তাই এ রাজ্যের বহু মেধাবী পড়ুয়া জ্যাম (JAM) ক্লিয়ার করেও আইআইটি-তে ভর্তি হতে পারবে না।” একই সঙ্গে চার বছর শেষে এই ব্যাকলগ থাকা পড়ুয়ারা ‘অনার্স উইথ রিসার্চ’ (Honours with Research) ডিগ্রি পাবেন কি না, তা নিয়েও একপ্রকার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে যেমন ফেলের হাত থেকে হাজার হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছে, ঠিক অন্যদিকে সর্বভারতীয় স্তরে এ রাজ্যের প্রথম সারির পড়ুয়াদের পিছিয়ে পড়ার এক স্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হলো বলেই মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ।


Recent Comments