একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন । ভারতের আকাশসীমা—পশ্চিমে স্যার ক্রিক (Sir Creek) থেকে উত্তরে সিয়াচেন (Siachen), সেখান থেকে পুবে অরুণাচলের লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (Line of Actual Control) পর্যন্ত—এই বিশাল ভূখণ্ডের আকাশ চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেওয়ার কথা ভারতীয় বায়ুসেনার (Indian Air Force) । কিন্তু বাস্তবটা কী? আজ সেই বায়ুসেনার হাতে আছে মাত্র ঊনত্রিশটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন (Squadron) । অথচ দুটি পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী—চীন (China) এবং পাকিস্তান (Pakistan)—একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করলে ন্যূনতম বিয়াল্লিশটি স্কোয়াড্রন দরকার । এই তেরোটি স্কোয়াড্রনের ফাঁক শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি জাতির নিরাপত্তার মেরুদণ্ডে চিড় । আর এই চিড় ক্রমশ চওড়া হচ্ছে ।
স্কোয়াড্রন ক্ষয়ের গল্প: একটি যুগের সমাপ্তি ও আসন্ন অন্ধকার
যেকোনো বিমান বাহিনীর শক্তির প্রাথমিক মাপকাঠি হলো তার ফাইটার স্কোয়াড্রন বা যুদ্ধবিমান বহরের সংখ্যা । ভারতীয় বায়ুসেনার একটি স্ট্যান্ডার্ড স্কোয়াড্রনে সাধারণত ষোলো থেকে আঠেরোটি যুদ্ধবিমান থাকে । বিয়াল্লিশটি স্কোয়াড্রনের যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল, সেটা কোনো আনুষ্ঠানিক ইচ্ছেপূরণ নয়—দুটি সীমান্তে একসঙ্গে যুদ্ধ চালানোর জন্য এটি ন্যূনতম প্রয়োজন বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বারবার জানিয়ে এসেছেন । অথচ ২০২৫ সালের শেষের দিকে বায়ুসেনার হাতে আছে মোটামুটি ৫২২টি ফাইটার এয়ারক্র্যাফ্ট (Fighter Aircraft) । এর মধ্যে রয়েছে রুশ, ফরাসি, ব্রিটিশ এবং দেশীয়—নানা ধরনের বিমান । এই বৈচিত্র্য শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবে এটি রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকে এক দুঃস্বপ্ন । আলাদা আলাদা স্পেয়ার পার্টস (Spare Parts), আলাদা প্রশিক্ষণ, আলাদা সাপ্লাই চেন (Supply Chain)—সব মিলিয়ে লজিস্টিক (Logistics) বোঝা এতটাই ভারী যে অনেক সময় বিমান থাকলেও সেটিকে উড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না ।
২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যখন মিগ-২১ বাইসন (MiG-21 Bison) আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিল, তখন অনেকের বুকে একটা চাপা কান্না ছিল । ছয় দশক ধরে এই বিমান ভারতীয় বায়ুসেনার মেরুদণ্ড ছিল । ১৯৬৫-র যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০১৯-এর বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক (Balakot Airstrike) এবং অপারেশন সিন্দূর—প্রতিটি বড় সংঘর্ষে মিগ-২১ ছিল সামনের সারিতে । কিন্তু ক্রমাগত দুর্ঘটনা, প্রযুক্তিগত সেকেলেপনা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এর অবসর অনিবার্য ছিল । এই অবসরের সঙ্গে সঙ্গে বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন সংখ্যা সরাসরি কমে ঊনত্রিশে নেমে এল ।
সামনের দশক আরও ভয়ংকর । সেপিক্যাট জাগুয়ার (SEPECAT Jaguar)—যেটি গভীর অনুপ্রবেশকারী স্ট্রাইক এয়ারক্র্যাফ্ট (Strike Aircraft) হিসেবে কাজ করে—সেটি ২০৩০ থেকে ২০৩৫-এর মধ্যে পুরোপুরি ফেজ আউট (Phase Out) হয়ে যাবে । দাসো মিরাজ ২০০০ (Dassault Mirage 2000), যেটি কারগিল যুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল, সেটিও ২০৩০-এর মধ্যে বিদায় নেবে । মিগ-২৯ ইউপিজি (MiG-29UPG) ফ্লিটেরও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে । এই তিনটি প্ল্যাটফর্ম (Platform) মিলিয়ে আরও প্রায় এগারোটি স্কোয়াড্রন অর্ডার অফ ব্যাটল (Order of Battle) থেকে সরে যাবে । জাগুয়ার ফ্লিটকে কোনোরকমে উড়িয়ে রাখতে বায়ুসেনা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্পেয়ার পার্টস জোগাড় করতে বাধ্য হচ্ছে । ওমান (Oman) থেকে কুড়িটি পুরনো এয়ারফ্রেম (Airframe) কেনা হয়েছে, ফ্রান্স (France) থেকে একত্রিশটি । ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইকুয়েডর (Ecuador)-এর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে—শুধুমাত্র তাদের কাছে গুদামজাত করা পুরনো জাগুয়ারগুলো থেকে ইঞ্জিন আর স্ট্রাকচারাল অ্যাসেমব্লি (Structural Assembly) উদ্ধার করতে ।
এই দৃশ্যটা যদি আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে, তাহলে আরও একটি তথ্য জেনে রাখুন—যদি নতুন বিমানের ইন্ডাকশন (Induction) এই আক্রমণাত্মক রিটায়ারমেন্ট রেট (Retirement Rate)-কে ছাপিয়ে যেতে না পারে, তাহলে আগামী দশকে ভারতীয় বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন সংখ্যা আঠেরো থেকে পঁচিশে নেমে আসতে পারে । এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়—এটি ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বা এয়ার ডিফেন্স নেটওয়ার্কের (Air Defense Network) জন্য এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন ।
কেনাকাটার ইতিহাস: প্রকিউরমেন্ট প্যারালাইসিসের দুই দশক
কেন এই অবস্থা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দশকের পর দশক ধরে চলা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে, যাকে বলা হচ্ছে ‘প্রকিউরমেন্ট প্যারালাইসিস’ (Procurement Paralysis) । ভারতের ফাইটার জেট কেনার ইতিহাসটা পড়লে মনে হয় যেন কোনো দীর্ঘ, যন্ত্রণাময় উপন্যাস । ২০০০ সালে ভারতীয় বায়ুসেনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল—সোভিয়েত যুগের পুরনো জেটগুলোর বদলে মিডিয়াম মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্র্যাফ্ট (Medium Multi-Role Combat Aircraft বা MMRCA) দরকার । ২০০১-এ রিকুয়েস্ট ফর ইনফরমেশন (Request for Information বা RFI) পাঠানো হল । ২০০৭-এ ১২৬টি বিমানের জন্য আনুষ্ঠানিক রিকুয়েস্ট ফর প্রোপোজাল (Request for Proposal বা RFP) জারি হল—আনুমানিক ৬.৭ বিলিয়ন ডলারের (Dollar) একটি বিশাল চুক্তি ।
দীর্ঘ কারিগরি মূল্যায়নের পর ২০১১-তে মাঠে রইল দুটি নাম—ইউরোফাইটার টাইফুন (Eurofighter Typhoon) এবং দাসো রাফাল (Dassault Rafale) । ২০১২-তে লাইফ সাইকেল কস্ট (Life Cycle Cost)-এর ভিত্তিতে সবচেয়ে কম দাম দেওয়া ভেন্ডর (Vendor) হিসেবে রাফালকে বেছে নেওয়া হল । এরপর যা ঘটল, সেটি ভারতের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় । ১৫ বছর ধরে ফাইল চালাচালি, প্রযুক্তি হস্তান্তর বা টেকনোলজি ট্রান্সফার (Technology Transfer) নিয়ে দড়ি টানাটানির পর ২০১৫ সালে পুরো এমএমআরসিএ (MMRCA) টেন্ডার (Tender) বাতিল করা হল । কারণ? দাসো অ্যাভিয়েশন (Dassault Aviation) স্পষ্ট জানিয়ে দিল—১০৮টি বিমান যেগুলো ভারতে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (Hindustan Aeronautics Limited বা HAL) লাইসেন্স প্রোডাকশন (License Production)-এ তৈরি করবে বলে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেগুলোর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিতে তারা রাজি নয় । একটি ফরাসি কোম্পানি ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি প্রতিরক্ষা কারখানার ওপর আস্থা রাখতে পারল না—এই তথ্যটি যতটা বেদনাদায়ক, ততটাই বাস্তব ।
এরপর ২০১৬-তে জরুরি ভিত্তিতে গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট (Government-to-Government) চুক্তিতে ছত্রিশটি রাফাল কেনা হল । ৩৬টি বিমান গুণগত মান বাড়ালেও সংখ্যার বিশাল গর্ত ভরাতে ব্যর্থ । আজ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ১১৪টি মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্র্যাফ্ট (Multi-Role Fighter Aircraft বা MRFA) কেনার নতুন প্রক্রিয়া শুরু করেছে, কিন্তু সেটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে আছে ।
তেজস এবং ইঞ্জিনের আক্ষেপ
বিদেশ থেকে কেনাকাটায় বারবার ধাক্কা খেয়ে বায়ুসেনা ভরসা রেখেছিল দেশীয় হালকা যুদ্ধবিমান তেজস (Tejas)-এর ওপর । গণনায় ভর দিতে সরকার ৮৩টি আপগ্রেডেড তেজস এমকে১এ (Tejas Mk1A) অর্ডার করেছে, আরও ৯৭টি ক্লিয়ার হয়েছে কেনার জন্য । কিন্তু এইচএএল (HAL) বারবার প্রোডাকশন ডেডলাইন (Production Deadline) মিস করে চলেছে । আর এখানেই আছে সবচেয়ে বড় সমস্যা—ইঞ্জিন সাপ্লাই (Engine Supply) । তেজস এমকে১এ-তে ব্যবহার হয় আমেরিকান (American) জেনারেল ইলেকট্রিক (General Electric বা GE) কোম্পানির F404-IN20 ইঞ্জিন । চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে দুটি ইঞ্জিন সরবরাহের কথা ছিল, কিন্তু ২০২৫-এর আগস্ট মাসে জিই (GE) একটিও ইঞ্জিন ডেলিভারি (Delivery) দিতে পারেনি । কারণ F404 প্রোডাকশন লাইন (Production Line) পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়েছে, এবং সেই গ্যাপ (Gap) এখনও পুরোপুরি পূরণ হয়নি । ফলে এইচএএল-এর অ্যাসেম্বলি লাইন (Assembly Line) প্রায় থমকে গেছে ।
ভারতীয় বায়ুসেনা ২০২৯-এর আগে ৮৩টি তেজস এমকে১এ পাওয়ার আশা করতে পারছে না । আর তেজস এমকে২ (Tejas Mk2)—যেটির জন্য দরকার জিই-F414 ইঞ্জিন (GE-F414 Engine)—সেটির সার্ভিসে আসতে ২০৩০-এর দশকের আগে কোনো সম্ভাবনা নেই । বাতিল হওয়া এমএমআরসিএ, আটকে থাকা এমআরএফএ, আর বিলম্বিত তেজস ডেলিভারি—তিনটি মিলিয়ে ২০৩৫-এর আগে তেরোটি স্কোয়াড্রনের ঘাটতি পূরণ করা কার্যত অসম্ভব । এর ফলে বায়ুসেনা এখন আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকে সরে এসে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় যেতে বাধ্য হচ্ছে । একটি বড় যুদ্ধে বায়ুসেনাকে বেছে নিতে হবে—কমান্ড সেন্টার (Command Centre) আর কৌশলগত ঘাঁটি রক্ষা করবে, নাকি সেনাবাহিনীর অগ্রসরমান দলকে ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট (Close Air Support) দেবে । দুটো একসঙ্গে করার বিলাসিতা আর নেই ।
জেট ইঞ্জিন: বিমান শিল্পের “হলি গ্রেইল”
যে কোনো দেশের আকাশশক্তির আসল পরিমাপ হল—সে নিজে যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন তৈরি করতে পারে কি না । এটিকে অনেক সামরিক বিশ্লেষক বলেন এভিয়েশন (Aviation)-এর “হোলি গ্রেইল” (Holy Grail) । স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও ভারত এই ক্ষেত্রে মর্মান্তিকভাবে ব্যর্থ ।
ইঞ্জিন তৈরি এত কঠিন কেন? একটি আধুনিক জেট ইঞ্জিন এমন একটি পরিবেশে কাজ করে যেটিকে “সংগঠিত নরক” বলা যেতে পারে । টারবাইনে প্রবেশ করা গ্যাসের তাপমাত্রা ৩০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (Fahrenheit) বা ১৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (Celsius) ছুঁয়ে যায় । এখানেই প্রকৌশলের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স (Paradox) লুকিয়ে আছে—টারবাইন ব্লেড (Turbine Blade) তৈরিতে ব্যবহৃত নিকেল-বেসড সুপারঅ্যালয় (Nickel-Based Superalloy) গলতে শুরু করে মাত্র ২৩০০ থেকে ২৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটেই । মানে ইঞ্জিনের ভেতরের তাপমাত্রা ব্লেডের গলনাঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি!
এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে দরকার হয় সিঙ্গল-ক্রিস্টাল ব্লেড (Single-crystal blade) প্রযুক্তি এবং বিশেষ মেটালার্জি বা ধাতুবিদ্যা (Metallurgy) । ভ্যাকুয়াম ফার্নেস (Vacuum Furnace)-এ ব্রিজম্যান প্রসেস (Bridgman Process) ব্যবহার করে গলিত সুপারঅ্যালয়ের কঠিনীভবন (Solidification) এতটাই নিয়ন্ত্রিতভাবে করা হয় যে পুরো টারবাইন ব্লেডটি একটি অবিচ্ছিন্ন, একক ক্রিস্টাল হিসেবে তৈরি হয় । গ্রেইন বাউন্ডারি পুরোপুরি বিলুপ্ত—ফলে ক্লান্তি-জীবন (Fatigue Life), ক্ষয়রোধ (Corrosion Resistance), এবং গলনাঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায় । প্রচুর স্ক্র্যাপ (Scrap) হয়, এবং চল্লিশটি ব্লেডের একটি সেটের দাম পৌঁছায় ৬,০০,০০০ ডলারে ।
ব্যর্থতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশকে এইচএফ-২৪ মারুত (HF-24 Marut) দুর্বল ইঞ্জিনের বন্দি হয়ে সাবসনিক (Subsonic) গতিতে সীমাবদ্ধ ছিল । এরপর ডিআরডিও (DRDO) ১৯৮৯ সালে কাবেরী ইঞ্জিন (Kaveri Engine) প্রকল্প অনুমোদন করল । প্রায় চার দশক ধরে টানা হল, কোটি কোটি টাকা খরচ হল, কিন্তু জিটিআরই (GTRE) প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখত বলে কাবেরী কখনও যুদ্ধবিমানে ওড়ার জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও (Thrust-to-Weight Ratio) অর্জন করতে পারল না ।
বিশ্বে মাত্র চারটি দেশ—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং রাশিয়া—ফাইটার ইঞ্জিন প্রযুক্তি প্রকৃত অর্থে আয়ত্ত করেছে । চীনও একসময় ভারতের মতোই আটকে ছিল, কিন্তু দেশীয় ডব্লিউএস-১০ “তাইহাং” (WS-10 “Taihang”) এবং আরও শক্তিশালী ডব্লিউএস-১৫ (WS-15) ইঞ্জিন তৈরি করে তারা এখন গণ-উৎসাদনে চলে গেছে । জে-২০ স্টেলথ ফ্লিট পুরোপুরি দেশীয় ইঞ্জিনে চলছে ।
ভারত সম্প্রতি আমেরিকার সাথে জিই-৪১৪ (GE-414) ইঞ্জিন ভারতে তৈরির চুক্তি করেছে ঠিকই, কিন্তু আমেরিকা ইঞ্জিনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি—’ভ্যাকুয়াম ইনভেস্টমেন্ট কাস্টিং’ (Vacuum Investment Casting) বা ক্রিস্টাল ব্লেড কাস্টিং—ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে না । এটি অত্যন্ত কৌশলগত । মূল ধাতুবিদ্যার রেসিপি (Recipe) আটকে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করছে যে ইঞ্জিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্য ভারত দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকান সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরশীল থাকবে । এটি একটি অত্যন্ত পরিশীলিত, ভূ-রাজনৈতিক লাইসেন্স-প্রোডাকশন ফাঁদ (License-Production Trap) ।
কলিউসিভ থ্রেটের বাস্তব চিত্র: দুই সীমান্তে একসঙ্গে যুদ্ধ
ভারতের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বে প্রায় অনন্য । দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ, এবং দুটি দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সমন্বয়—এই “কলিউসিভ থ্রেট” (Collusive Threat) মোকাবেলা করাটাই ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্স (PLAAF) গত দেড় দশকে যে গতিতে আধুনিকীকরণ করেছে, সেটি স্রেফ চমকপ্রদ । তাদের হাতে রয়েছে প্রায় ১২০০ আধুনিক যুদ্ধবিমান । জে-২০ (J-20) স্টেলথ ফাইটার এখন হাই-রেট ম্যানুফ্যাকচারিং (High-Rate Manufacturing)-এ ঢুকে গেছে এবং এটি তাদের তুরুপের তাস । তিব্বতের মালভূমিতে তারা রানওয়ে বড় করেছে এবং শক্তপোক্ত বা হার্ডেনড (Hardened) শেল্টার বানিয়েছে । ওয়াই-২০ (Y-20) রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার (Refuelling Tanker)-এর সংযোজন তাদের ফ্লিটের অপারেশনাল রেডিয়াস (Operational Radius) কার্যত দ্বিগুণ করে দিয়েছে ।
অন্যদিকে, পাকিস্তান এয়ার ফোর্স (Pakistan Air Force বা PAF) চীনের সাহায্যে তাদের প্রায় ৪৫০টি ফাইটারের ফ্লিটকে উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিক করে ফেলেছে । জে-১০সি “ভিগোরাস ড্রাগন” (J-10C “Vigorous Dragon”) এবং জেএফ-১৭ ব্লক III (JF-17 Block III)-এর সংযোজন পাকিস্তানকে দিয়েছে অত্যন্ত উন্নত রাডার এবং পিএল-১৫ (PL-15) মিসাইল । এই আধুনিকীকরণের বাস্তব পরীক্ষা হল ২০২৫ সালের মে মাসে কাল্পনিক বা প্রজেক্টেড সংঘাত ‘অপারেশন সিন্দূর’ (Operation Sindoor)-এ । পাকিস্তান তাদের জে-১০সি এবং উইং লুং II (Wing Loong II) ইউএভি (UAV) মিলিয়ে একটি সমন্বিত স্ট্রাইক প্যাকেজ পাঠায় । এই সংঘর্ষে দেখা যায়, পিএল-১৫ মিসাইল ভারতের ইউরোপীয় মেটিওর মিসাইল (Meteor Missile)-কেও ছাড়িয়ে গেছে । এই আধুনিকীকরণের ফলে পাকিস্তানের সাথে ভারতের পুরনো প্রযুক্তিগত ব্যবধান বা কোয়ালিটেটিভ এজ (Qualitative Edge) দ্রুত মুছে যাচ্ছে ।
সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি—চীন ও পাকিস্তান একসঙ্গে সমন্বিত আক্রমণ চালালে কী হবে? পুরোনো ওয়ারগেমিং মডেল অনুযায়ী চীনের বিরুদ্ধে ৪৫০টি এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৪৫০টি ফাইটার মোতায়েন দরকার । কিন্তু মোট ৫২২টি বিমান নিয়ে সেটা কীভাবে সম্ভব? গাণিতিক হিসাবে এটি স্পষ্ট—বায়ুসেনা পূর্ব সেক্টরে (Eastern Sector) চীনের কাছে স্থানীয় আকাশ শ্রেষ্ঠত্ব (Air Superiority) ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে । একটি আরও উদ্বেগজনক তথ্য—ভারতীয় বায়ুসেনায় পাইলট-টু-ককপিট রেশিও (Pilot-to-Cockpit Ratio) মাত্র ০.৮৪, অর্থাৎ প্রতিটি বিমানের জন্য একজন পূর্ণাঙ্গ পাইলটও নেই । অথচ পাকিস্তানের এই রেশিও ২.৫ ।
রাজনীতি, আমলাতন্ত্র এবং মেধা পাচার: ঘরের শত্রু বিভীষণ
ভারতীয় বায়ুসেনার এই প্রযুক্তিগত এবং সংখ্যাগত ঘাটতির মূলে আছে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যাধি । প্রথমত, ডিফেন্স পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংস (DPSUs)—যেমন এইচএএল এবং ডিআরডিও—কে দেওয়া পরম একচেটিয়া অধিকার উদ্ভাবন ও জবাবদিহিতা দুটোকেই শ্বাসরোধ করেছে । দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রতিরক্ষা সংগ্রহ ঐতিহাসিকভাবে “এল-ওয়ান” (L1 Vendor) বা সবচেয়ে কম দামি দরদাতার কাঠামো দ্বারা পক্ষাঘাতগ্রস্ত । এটি লাইফ সাইকেল কস্ট (LCC)—অর্থাৎ রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশের দাম—সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ।
শুধু যন্ত্রপাতি নয়, ভারত তীব্র মেধা পাচার বা ‘ব্রেন ড্রেন’ (Brain Drain)-এর শিকার । আইআইটি (IIT)-র মতো প্রতিষ্ঠানের সেরা মেধা—প্রায় ৬২ শতাংশ টপার—পড়াশোনা শেষেই দেশ ছেড়ে চলে যায় । তারা কাজ করে বোয়িং (Boeing) বা এয়ারবাস (Airbus)-এর মতো পশ্চিমা কোম্পানিতে । আর্থিক প্রণোদনার অভাব এবং দমবন্ধ করা আমলাতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করছে যে ভারতের সেরা মস্তিষ্কগুলো ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য নয়, মার্কিন বায়ুসেনার জন্য ইঞ্জিন ডিজাইন করছে । গবেষণা বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, চীনের প্রতিরক্ষা গবেষণা বাজেট (প্রায় ৪৪.৪ বিলিয়ন ডলার) ভারতের (২.৮ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে প্রায় পনেরো গুণ বড় ।
আশার আলো এবং ২০৩৫-এর আগে করণীয়
এত অন্ধকারের মধ্যেও একটি বড় পরিবর্তন এখন চলছে—ভারতীয় বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর উল্কাগতির উত্থান । টাটা (Tata) এবং লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (Larsen & Toubro)-র মতো কোম্পানি প্রাইমারি অ্যারোস্পেস ইন্টিগ্রেটরে রূপান্তরিত হচ্ছে । ‘আত্মনির্ভর ভারত’ (Atmanirbhar Bharat)-এর আওতায় এখন বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্র্যাফ্ট (AMCA) বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য । এইচএএল-কে তার ঐতিহ্যগত একচেটিয়া ভূমিকা থেকে স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে ।
তবে একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—২০৩৫ সালের মধ্যে কি ভারতীয় বায়ুসেনা সত্যিই তার সংখ্যাগত এবং গুণগত ব্যবধান কমাতে পারবে? সংগ্রহের সময়সূচি এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বলছে—২০৩৫-এর মধ্যে এই ঘাটতি কাটানো সম্ভব নয় । বিয়াল্লিশটি স্কোয়াড্রনের সংখ্যাগত লক্ষ্য কৌশলগত প্রতিরোধের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না ।
ভারতকে এখন ‘অ্যাসসিমেট্রিক ডিটারেন্স’ (Asymmetric Deterrence) বা অপ্রচলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হবে । এর অর্থ হলো—আরও বেশি করে এস-৪০০ (S-400) এর মতো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করা, মানুষবিহীন ড্রোন বা আনম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকেল (UCAVs) এবং ড্রোন সোয়ার্মের ওপর জোর দেওয়া, এবং প্রাইভেট সেক্টরকে গবেষণার কাজে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া ।
এই রিপোর্ট কোনো ভয়ের বার্তা নয়, বরং এটি একটি জেগে ওঠার ডাক বা ওয়েক-আপ কল (Wake-up Call) । লাল ফিতের বাঁধন ছিঁড়ে এবং পুরনো মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে যদি এখনই পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ২০৩৫ সালে আমাদের আকাশসীমা অরক্ষিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে । ঘড়ির কাঁটা ২০৩৫-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । সময় ফুরিয়ে আসছে । ভারত কি ঘুম থেকে জেগে উঠবে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে আরও একবার?
তথ্যসূত্র ও সত্যতা যাচাই
| তথ্যের দাবি / প্রেক্ষাপট | এক্সটার্নাল সোর্স লিঙ্ক |
|---|---|
| স্কোয়াড্রন ঘাটতি (২৯ বনাম ৪২): ভারতীয় বায়ুসেনা বর্তমানে আনুমানিক ২৯ থেকে ৩১টি সক্রিয় স্কোয়াড্রন পরিচালনা করছে, কিন্তু দুই ফ্রন্টের যুদ্ধ সামলাতে তাদের অনুমোদিত শক্তি ৪২টি স্কোয়াড্রন হওয়া প্রয়োজন। | The Hindu: IAF’s unending fighter conundrum Testbook: Current strength of fighter squadrons in IAF |
| মিগ-২১ এর অবসর (২০২৫): ভারতীয় বায়ুসেনার ঐতিহাসিক মেরুদণ্ড মিগ-২১ বাইসন ফ্লিট ২০২৫ সালের শেষের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিয়েছে। | The War Zone: India’s Iconic MiG-21 Blasts Off Into Retirement GKToday: IAF Retires Iconic MiG-21 |
| তেজস এমকে১এ বিলম্ব / F404 ইঞ্জিন: বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইনের চাপের কারণে জিই (GE) অ্যারোস্পেস F404 ইঞ্জিন সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় হ্যাল (HAL) তেজস এমকে১এ-এর ডেলিভারি সময়সীমা মিস করেছে। | India Today: Tejas Mk1A hit by GE engine delays |
| কাবেরী ইঞ্জিনের ব্যর্থতা: ডিআরডিও-র (DRDO) GTX-35VS কাবেরী ইঞ্জিন প্রকল্প প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট-টু-ওয়েট রেশিও অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা ক্যাগ (CAG) রিপোর্টে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। | AlphaDefense: GTRE Kaveri Engine Progress from 2011 CAG Report CAG Compliance Audit Report 16 of 2010 |
| GE-F414 প্রযুক্তি হস্তান্তরের সীমাবদ্ধতা: GE F414 ইঞ্জিনের ৮০% প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তিতে সিঙ্গল-ক্রিস্টাল টারবাইন ব্লেডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেটালার্জিক্যাল “রেসিপি” এবং “ভ্যাকুয়াম ইনভেস্টমেন্ট কাস্টিং” প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। | MRO Business Today: HAL–GE F414 engine collaboration Defence.in: GE to Retain Control Over Single Crystal Blade |
| বিমানবহরের বৈষম্য (PLAAF বনাম IAF): চীনের PLAAF-এর কাছে প্রায় ১২০০-এর বেশি আধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে, যা ভারতের সক্রিয় ফাইটার ফ্লিটের সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি। | SP’s Aviation: LCA Mk1A Delayed, MRFA on Slow Mode |
| চীনের ইঞ্জিনের সাফল্য (WS-10/WS-15): চীন মেটালার্জিক্যাল বাধা অতিক্রম করেছে এবং তাদের J-20 স্টেলথ ফাইটার ফ্লিটের জন্য সফলভাবে WS-10 এবং উচ্চ-থ্রাস্ট সম্পন্ন WS-15 ইঞ্জিনের ব্যাপক উৎপাদন করছে। | EurAsian Times: China’s J-20 Closes Gap with F-35; WS-15 Engine Military Watch Magazine: J-20 With WS-15 Complete Serial Production |
| পাইলট-টু-ককপিট রেশিও: ভারতীয় বায়ুসেনা ঐতিহাসিকভাবে কম পাইলট-টু-ককপিট রেশিওর (সাধারণত ০.৮৪ থেকে ১.২৫-এর মধ্যে) কারণে ভুগছে, যেখানে পাকিস্তানের এই রেশিও অনেক বেশি (প্রায় ২.৫)। এটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে সর্টি (Sortie) তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। | The Tribune: IAF: Tale of deficiencies & mismanagement India Today: Air Force faces pilot shortage (CAG report) |
