স্থলে জলে বনতলে... নিউজস্কোপ-এর নিবেদন
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে এখন উৎসবের আমেজ। আর বাঙালির বসন্ত মানেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান এবং শান্তিনিকেতনের সেই বিখ্যাত বসন্তোৎসব। তবে সময়ের সাথে সাথে শান্তিনিকেতনের সেই চিরাচরিত দোলযাত্রার রূপরেখা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। ‘নিউজস্কোপ বাংলা’-র পক্ষ থেকে আমরা আজ বসন্তের সেই সুর ও দর্শনের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করব, যেখানে আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে রয়েছেন স্বনামধন্য অধ্যাপক এবং নিউজস্কোপ-এর প্রতিষ্ঠাতা বুড়োশিব দাশগুপ্ত।
রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’-এর গানগুলো বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বুড়োশিব দাশগুপ্তের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি শ্রোতাদের মনে রবীন্দ্রনাথের গান যে কী গভীর প্রভাব ফেলে, সেই কৌতূহল থেকেই তিনি এই অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন।
শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব: ঐতিহ্য বনাম বর্তমান বিধিনিষেধ
শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পর্যটকদের অত্যধিক ভিড় এবং বিশৃঙ্খলার কারণে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ গত কয়েক বছর ধরে দোলযাত্রার ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এখন আর আগের মতো উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বাইরের মানুষের জন্য সেই চেনা রঙের উৎসব আয়োজিত হয় না। শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই এই উৎসবকে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা চলছে, যাতে আশ্রমের পবিত্রতা বজায় থাকে। এই পরিবর্তন অনেক রবীন্দ্রপ্রেমীকেই ব্যথিত করেছে, তবে প্রকৃতির সাথে শান্তিতে মিলিত হওয়ার যে মূল সুর, তা আজও আশ্রমের বাতাসে মিশে আছে।
প্রকৃতির সুর ও প্রেমের পর্যায়: বসন্তের গান
রবীন্দ্রনাথের বসন্ত পর্যায়ের গানগুলো মূলত ‘প্রকৃতি’ এবং ‘প্রেম’-এই দুই পর্যায়ের মেলবন্ধন। যেমন— “ওরে গৃহবাসী” গানের মাধ্যমে তিনি সবাইকে ঘরে ছেড়ে বাইরে প্রকৃতির উৎসবে সামিল হওয়ার ডাক দিয়েছেন। আবার “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়” বা “ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে” গানগুলোতে বসন্তের উন্মাদনা ফুটে ওঠে। অন্যদিকে “রাঙিয়ে দিয়ে যাও” বা “দোল প্রেমের দোলনচাঁপা” গানগুলোতে প্রকৃতি আর মানুষের মনের প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
‘বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী’: একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ
অধ্যাপক বুড়োশিব দাশগুপ্ত বসন্তের একটি বিশেষ গানের ওপর আলোকপাত করেছেন— “বাসন্তী হে ভুবনমোহিনী”। এই গানটির সুর দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকী ঘরানা দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব। গানটির তিনটি স্তবকে এক অদ্ভুত বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:
প্রথম স্তবক: এখানে বর্ণিত হয়েছে বসন্তের আগমনে পরিবেশ কীভাবে সাড়া দিচ্ছে। প্রকৃতির প্রতিটি অণু-পরমাণু যেন উন্মুখ হয়ে আছে।
দ্বিতীয় স্তবক: বসন্ত স্বয়ং এই পৃথিবীর ওপর কী প্রভাব ফেলছে এবং পৃথিবী কীভাবে সেই ছোঁয়ায় নতুন রূপ ধারণ করছে, তা ফুটে উঠেছে।
তৃতীয় স্তবক: এটি এক চরম পর্যায়, যেখানে পরিবেশ এবং পৃথিবী উভয়েই বসন্তের জাদুকরী শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে এক পরম শান্তিতে বিলীন হচ্ছে।
বসন্তের গানের গভীর দর্শন
রবীন্দ্রনাথের কাছে বসন্ত মানে কেবল ফুলের সমারোহ নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন আধ্যাত্মিক রূপান্তর। তাঁর গানে বসন্ত আসে ‘বিবাগী’ হয়ে, আবার কখনও ‘রাজা’র বেশে। বসন্তের গানের অন্যতম প্রধান দিক হলো ‘রিক্ততা থেকে পূর্ণতা’। শীতের শুষ্কতাকে মুছে ফেলে নতুন কিশলয় জন্মানোর যে প্রক্রিয়া, তাকেই কবি মানুষের জীবনের দুঃখ কাটিয়ে ওঠার শক্তির সাথে তুলনা করেছেন।
বসন্তের অনেক গানেই আমরা পাই ‘বিরহ’ ও ‘মিলন’-এর এক অদ্ভুত খেলা। কবির দর্শনে, বসন্ত হলো এক মোহিনী শক্তি যা মানুষকে মায়া এবং বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়। সুরের মূর্ছনায় কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃতি আর মানুষের আত্মা আলাদা কিছু নয়। যখন বনে আগুন লাগে (পলাশ বা শিমুলের রাঙা রঙে), সেই আগুনের আঁচ লাগে মানুষের মনেও। এই “Internal Philosophy” বা অভ্যন্তরীণ দর্শনই রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বিশ্বের অন্যান্য গান থেকে আলাদা করে তোলে।
