পঞ্জিকার পাতা উল্টে ১৪৩২ বঙ্গাব্দ বিদায় নিয়ে এসেছে ১৪৩৩। ‘পুরোনো’কে বিদায় জানিয়ে ‘নতুন’কে নিয়ে মেতে উঠেছে বাঙালি। গত কয়েকদিন ধরে শহর কলকাতা থেকে গ্রাম-বাংলা মেতে ছিল বৈশাখী উৎসবে। কিন্তু এবারের নববর্ষের উদযাপন কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেছে— বাঙালির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য কি এখন নিছকই সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টে পরিণত হয়েছে? প্রথাগত ‘হালখাতা’ আর ‘পুজোর’ থেকেও কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইনস্টাগ্রাম রিল আর “এস্থেটিক (aesthetic)” দেখানোর ট্রেন্ড? নাকি এটি নতুনভাবে ‘নতুন’কে গ্রহণ করার একটি পন্থা?
নববর্ষের দিন সকালে মন্দিরে গিয়ে লাইন দেওয়া বা দোকানে দোকানে গিয়ে মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করার উন্মাদনা আজ কিছুটা হলেও ফিকে হয়েছে। তার বদলে ভোরের আলো ফুটতেই দেখা যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন হেরিটেজ ক্যাফে বা ভিক্টোরিয়ার সামনে তরুণ-তরুণীদের ভিড়। উদ্দেশ্য? নববর্ষের প্রথম সূর্যে একটি পারফেক্ট ‘সিনেমাটিক শট’ নেওয়া অথবা বাঙালি সেজে ইনস্টাগ্রাম “এস্থেটিক” পোস্টে ভরিয়ে দেওয়া।
যে ‘হালখাতা’কে নববর্ষের প্রতীক বলা চলে কিংবা যাকে কেন্দ্র করে বাঙালির ব্যবসা আর বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটত, ২০২৬ সালে এসে সেই চেনা চেহারাও অনেকটাই বদলেছে। বহু দোকানে সেই চিরচেনা লাল রঙের হালখাতা থাকলেও লেনদেন চলছে UPI-তেই। অনেকের মতেই ঐতিহ্যও চলে যাচ্ছে পুরোনো বছরের মতো। অনেক প্রৌঢ় বা “Gen-X” বা “Gen-Y “-দের মতে, নববর্ষের থেকেও ফটো ফিল্টারেই এখনকার ছেলেমেয়েদের আগ্রহ বেশি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? অনেকের মনে হতেই পারে এই প্রজন্মের ঐতিহ্যের থেকেও বেশি আগ্রহ “এস্থেটিক” হওয়া নিয়ে।কিন্তু আদপে কি তাই?
এই ‘এস্থেটিক’ প্রেমের কারণেই কিন্তু বাংলার মৃতপ্রায় হস্তশিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এই তরুণদের হাত ধরেই হ্যান্ডলুম শাড়ি কিংবা হস্তশিল্পের প্রচার গ্রামীণ কারিগরদের নতুন দিশা দেখাচ্ছে। শুধু কি তাই? এই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই “Gen-Z”-দের হাত ধরে বাঙালির আচার-অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্য পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। এই প্রজন্মের কারণেই হারিয়ে যাওয়া কোনো পুরোনো গান বা রেট্রো মিউজিক রিমেক হয়ে নতুন রূপে ফিরে আসছে। তারা যেমন কোনো কনসার্টে গিয়ে বাদশা (Badshah) বা সুনিধি চৌহানের (Sunidhi Chauhan) গানে তাল মেলাচ্ছে, তেমনই সমান তালে লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) ‘আভি না যাও ছোড় কর’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’-ও শুনছে।
এই প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে ইনস্টাগ্রামে এস্থেটিক পোস্টে ভরিয়ে দেওয়া মানে ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলা নয়, বরং এটি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অভাবনীয় মেলবন্ধন। এই প্রজন্ম দেখিয়েছে নতুনভাবে ‘নতুন’কে গ্রহণ করার ভঙ্গি। তাদের পথ আর মত আলাদা হতেই পারে, কিন্তু শিকড় তো এক।


Recent Comments