নিউজস্কোপ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন: যেকোনো রাজ্যে বা ভারতবর্ষ (India) জুড়ে যখন নির্বাচন আসে, তখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের নানা জল্পনা তৈরি হয়। সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু যে খাতের ওপর নির্ভর করে লক্ষ লক্ষ মানুষের রুটিরুজি, সেই পরিবহণ (Transport) ব্যবস্থার কি কোনো পরিবর্তন হয়? এই জ্বলন্ত প্রশ্নটিই ফের একবার সামনে তুলে এনেছেন পরিবহণ শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে যুক্ত থাকা অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব তপন বন্দ্যোপাধ্যায় (Tapan Banerjee)।
আগামী ৪ মে, ২০২৬ তারিখে রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হতে চলেছে। কিন্তু যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বেসরকারি পরিবহণ খাতের যে ভগ্নদশা, তা থেকে এই শিল্পকে টেনে তোলা আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বাসমালিক থেকে শুরু করে শ্রমিকরা।কোভিডের ধাক্কা এবং আনুষঙ্গিক ক্ষতিকোভিড-১৯ (Covid-19) মহামারীর পর থেকে গোটা রাজ্য জুড়ে বেসরকারি পরিবহণ খাত কার্যত কোমায় চলে গিয়েছে।
অনেকেই হয়তো জানেন না, কৃষিকাজের পরেই দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। গ্যারেজ মিস্ত্রি থেকে শুরু করে বাস স্ট্যান্ডের ছোট ছোট ভাতের হোটেল, চায়ের দোকান— অসংখ্য মানুষের অন্নসংস্থান হয় এর ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু নিউজস্কোপ বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, এই বৃহত্তর গোষ্ঠীর দিকে নজর দেওয়ার মতো সদিচ্ছা কোনো সরকারেরই নেই। একমাত্র এই শিল্পই মহামারীর সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে কোনো রকম সহযোগিতা পায়নি।কেন্দ্রীয় নীতির কড়া সমালোচনাকেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে তপনবাবু জানান, অনেক সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা এমন আচরণ করেন যেন এই দেশের রাস্তাঘাট সিঙ্গাপুর (Singapore), লন্ডন (London) বা জাপান (Japan)-এর মতো।
পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না তৈরি করেই একের পর এক নির্দেশিকা চাপিয়ে দেওয়া হয়। দেশের টোল প্লাজাগুলোতে খেয়ালখুশি মতো টোল আদায় করা হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী সার্ভিস রোড থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা মেলে না। নব্বইয়ের দশকে বাসের বিমা (Insurance) সংক্রান্ত একটি মামলায় জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটস (Joint Council of Bus Syndicates) দেশের উচ্চ আদালতে জয়লাভ করেছিল। সেই সময় বিমা কোম্পানিগুলোর একতরফা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার সেই একই প্রহসন শুরু হয়েছে। কলকাতা (Kolkata) উচ্চ আদালতে এখনও এই সংক্রান্ত একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ট্রান্সপোর্ট কমিটির সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাসমালিকদের ১৫ শতাংশ চড়া সুদে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিতে হয়, যেখানে গৃহঋণ বা কৃষিঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার অনেকটাই কম। উপরন্তু, ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হলেও তা জিএসটি-র (GST) আওতায় আনা হচ্ছে না।রাজ্য সরকারের উদাসীনতা ও বাস ভাড়ার রাজনীতিরাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এই প্রবীণ পরিবহণ ব্যবসায়ী। এই রাজ্যে শেষবার বাস ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছিল ২০১৮ সালে। দীর্ঘ ৮ বছর কেটে গেলেও ভাড়া বাড়েনি। চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন বাসমালিকেরা। রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে একাধিকবার রাস্তায় নেমে প্রশ্ন করতে শোনা গেছে, “বাস কোথায়?”
তপনবাবুর কথায়, বাস তো আর মঙ্গল গ্রহে চলে যায়নি! কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে ভাড়া না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে আজ এই শিল্প পুরোপুরি রুগ্ন হয়ে পড়েছে। সরকার নিজে যে স্বল্প সংখ্যক বাস চালায়, তার জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। কিন্তু বেসরকারি বাসমালিকদের তো আর ‘গৌরী সেন’ নেই যে নিজেদের পকেট থেকে দিনের পর দিন ক্ষতিপূরণ দিয়ে বাস চালাবেন। রাস্তায় বেরোলেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অজুহাতে পুলিশের ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার জরিমানা এই বোঝাকে আরও ভারী করে তুলেছে।
বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা১৯৭৫ সালে যখন তপনবাবু এই পেশায় এসেছিলেন, তখন বাস ভাড়া ছিল মাত্র ১০ পয়সা এবং ডিজেল লিটার প্রতি ৮০ পয়সা। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ডিজেলের দাম ৯৩ টাকা, আর বাস ভাড়া মাত্র ৭ টাকা! একটি সাধারণ বাস রাস্তায় নামাতে খরচ হয় ২৭ থেকে ২৮ লক্ষ টাকা। আরটিও (RTA) বা আঞ্চলিক পরিবহণ কর্তৃপক্ষগুলো নিজেরাই জানে যে আগে এক একটি রুটে কত বাস চলত আর আজ কত চলছে।
বাসের পারমিট নেওয়ার এখন আর কোনো লোক নেই। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে বহু মালিক হারিয়ে যাচ্ছেন। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। আগে ভিন রাজ্য থেকেও বহু মানুষ এখানে কাজ করতে আসতেন, আজ আর কেউ এই ব্যবসায় আসতে চাইছেন না।


Recent Comments