সাফল্যের কোনো শর্টকাট হয় না, তা বারবার প্রমাণ করেছেন এমন অনেক মানুষ, যাঁদের জীবনটাই একটা কঠিন সংগ্রাম। আজ আমরা এমন একজনের কথা বলব, যিনি একসময় অভাবের তাড়নায় রাস্তায় সবজি বিক্রি করতেন। এমনকি স্কুলের গণ্ডি পেরোতে গিয়েও হোঁচট খেয়েছিলেন, উচ্চ মাধ্যমিকে হয়েছিলেন ফেল। কিন্তু তাঁর জেদ আর আত্মবিশ্বাস এতটাই প্রবল ছিল যে, সমস্ত বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তিনি আজ একজন সফল প্রশাসনিক আধিকারিক।
এই হার না মানা মানুষটির নাম নারায়ণ কোঁয়ার (Narayan Konwar)। তাঁর জীবনের এই রূপকথার মতো উত্থান আজ দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের কাছে এক বিরাট অনুপ্রেরণা। অভাবের সংসারে লড়াইয়ের শুরুনারায়ণের জন্ম ও বেড়ে ওঠা অসম (Assam)-এর মরিগাঁও (Morigaon) জেলার এক অত্যন্ত সাধারণ এবং দরিদ্র পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নেমে আসে যখন তাঁর বয়স মাত্র ১১ বা ১২ বছর। ওইটুকু বয়সেই তিনি তাঁর বাবাকে হারান। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে ছোট্ট নারায়ণের কাঁধে। একদিকে পড়াশোনার প্রতি তীব্র আকর্ষণ, অন্যদিকে সংসারের পেট চালানোর তাগিদ। বাধ্য হয়েই এই কিশোর বয়সে তিনি বাজারের সবজি বিক্রেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। মায়ের সামান্য আয়ের পাশাপাশি সবজি বিক্রির টাকা দিয়েই কোনোরকমে তাঁদের সংসার চলত।
উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল এবং ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পঅভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা কখনোই সহজ ছিল না। প্রতিদিন তাঁকে স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। সারাদিন সবজি বিক্রি করা, এতটা দীর্ঘ পথ সাইকেলে বা হেঁটে যাতায়াত করা এবং সংসারের আর্থিক অনটনের মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে তাঁর পড়াশোনার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। যার ফলস্বরূপ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি অকৃতকার্য হন।সমাজের অনেকেই সেই সময় ভেবেছিলেন, এই ছেলের দ্বারা আর কিছু হবে না। হয়তো সারাজীবন তাঁকে বাজারে ওই সবজি বিক্রি করেই কাটাতে হবে। কিন্তু নারায়ণ হার মানতে শেখেননি।
উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করার পর হতাশায় ভেঙে না পড়ে, দ্বিগুণ উদ্যমে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়ান। কঠোর পরিশ্রমে তিনি সেই বাধা পার করেন এবং পরবর্তীতে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় (Guwahati University) থেকে নিজের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ইউপিএসসি (UPSC) জয় ও আইএএস (IAS) হওয়ার স্বপ্নপূরণবিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে তাঁর মনে জেদ চেপে বসে যে, সমাজের জন্য এবং নিজের পরিবারের জন্য তাঁকে বড় কিছু একটা করতেই হবে। আর সেই লক্ষ্যেই তিনি সিভিল সার্ভিস (Civil Service) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। দিনরাত এক করে পড়াশোনা করা শুরু করেন তিনি।
তাঁর এই অক্লান্ত পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়নি। ২০১০ সালে দেশের সবচেয়ে কঠিন এই পরীক্ষায় তিনি ১১৯ তম র্যাঙ্ক অর্জন করে একজন আইএএস অফিসার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। যেই ছেলেটা একদিন স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি, সেই ছেলেই দেশের শীর্ষ স্তরের পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে সবাইকে চমকে দেন। বর্তমান জীবন ও তরুণদের জন্য বার্তাবর্তমানে নারায়ণ অসম সরকারের শিক্ষা দপ্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
একজন দক্ষ এবং সৎ প্রশাসনিক আধিকারিক হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম রয়েছে। তবে নিজের শিকড়কে তিনি ভুলে যাননি। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও সেমিনারে যান এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। নিজের জীবনের লড়াইয়ের গল্প শুনিয়ে তিনি যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেন।


Recent Comments