“প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা/,চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য/কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।”
~ সুভাষ মুখোপাধ্যায়
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন এই শব্দ গুলি সাজিয়েছিলেন, তখন তাঁর কলমে মিশে ছিল শোষিত শ্রমিকদের কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস ও এক পাহাড় সমান ক্ষোভ। ১লা মে, শ্রমিক দিবস – যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ,আজকের এই আট ঘণ্টার কর্মদিবস কিংবা শ্রমিকের নুন্যতম মর্যাদা কোনো দয়াদাক্ষিণ্যে আসেনি। এটি এসেছে ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে-মার্কেট চত্বরের তপ্ত রক্ত আর ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলা শ্রমিক নেতাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে।
এই শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে নয় বরং এটি ছিল শ্রমিকদের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তৎকালীন সময়ে শ্রমিকদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়, তাদের কাজের কোন সময়সীমা ছিল না। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরেও তাদের পারিশ্রমিক জুটতো খুবই সামান্য। এমনকি সামাজিক স্বীকৃতি এবং অন্যান্য নাগরিকত্বের অধিকার থেকেও তাদের বিচ্ছিন্ন করা হতো। কলকারখানা তে কাজ করতে গিয়ে অঙ্গহানি কিংবা মৃত্যু হলেও কোনরকম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো না।আর ঠিক এই কারণে ৮ ঘন্টা কাজের দাবি নিয়ে শ্রমিকরা বিপ্লব শুরু করেন।
শ্রমিক আন্দোলনের শুরুটা হয় মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে। সেই একই সময় ইউরোপে চলেছিল শিল্প বিপ্লব। ১৭০০-এর দশকের শেষের দিকে ইংল্যান্ডে ছোট ছোট শ্রমিক গোষ্ঠী তৈরি হতে থাকে।১৮২৪ সালে ইংল্যান্ডে ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনি বাধা দূর হলে আন্দোলন আরও সংগঠিত হয়। শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো ১৮৮৬ সালের ১লা মে। আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকরা যে গণআন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেটিই আজকের আধুনিক শ্রমিক অধিকারের ভিত্তি।
ওইদিন অর্থাৎ ১লা মে,এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমেরিকার বিভিন্ন শহরের শ্রমিকরা ঐতিহাসিক এক ধর্মঘটের ডাক দেন। শিকাগো শহরের সেই আন্দোলন বিশাল আকার ধারণ করে যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক একত্রিত হয়েছিলেন। শুধু শিকাগো শহরেরই প্রায় 40 হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমেছিলেন, পুরো আমেরিকা জুড়ে এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় তিন থেকে পাঁচ লক্ষের মধ্যে। শিকাগো এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কারণ ছিল ‘ম্যাককর্মিক রিপার ফ্যাক্টরি’ (McCormick Reaper Works)। এই ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা দীর্ঘকাল ধরে শোষিত হচ্ছিলেন।
এই আন্দোলন অনেক শ্রমিকের প্রাণও নিয়েছিল। আন্দোলন চলাকালীন ৩রা মে আনুমানিক ২ থেকে ৬ জন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হন এবং আরো অনেক সংখ্যক শ্রমিক আহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে ৪ঠা মে হে -মার্কেট চত্বরে একটি সভার ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সবাও সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে হয়নি। কোন এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির আজমকা করা বোমা আক্রমণে ৭ জন পুলিশ অফিসার নিহত হন। এরপরই পুলিশ নির্বিচারে শ্রমিকদের ওপর গুলি চালালে কমপক্ষে ৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক আহত হন।
বোমা হামলার ঘটনায় কোন প্রমাণ না থাকা সত্তেও ৮ জন শ্রমিক নেতা কে গ্রেফতার করা হয়। তাদের ” বিপ্লবী বক্তৃতার” মাধ্যমে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।ওই ৮ জনের মধ্যে চারজনের পরিণতি হয় ফাঁসি।তাঁরা হলেন –
আগস্ট স্পাইস(August Spies ), আলবার্ট পারসনস(Albert Parsons), অ্যাডলফ ফিশার(Adolph Fishcher)ও জর্জ এঙ্গেল ( George Engel)। বাকি চারজনের মধ্যে একজন , লুই লিংগ ( Louis Lingg) ফাঁসির আগের রাতে জেলে আত্মহত্যা করেন। বাকি তিনজনের দুজন, স্যামুয়েল ফিল্ডেন (Samuel Fielden) ও মাইকেল শোয়াব(Michael Schwab)- কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ( পরে ক্ষমা পান)দেওয়া হয় এবং এবং আরো একজন অস্কার নিবে(Oscar Neebe)- কে ৫ বছরের কারাদণ্ড ( পরে ক্ষমা পান)দেওয়া হয়।
আগস্ট স্পাইস ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—“এমন একটা দিন আসবে যখন আমাদের নিস্তব্ধতা তোমাদের সেই চিৎকারের চেয়েও শক্তিশালী হবে, যা আজ তোমরা শ্বাসরোধ করে দমিয়ে দিচ্ছ।”১৮৯৩ সালে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জন পিটার আল্টগেল্ড (John Peter Altgeld) সরকারিভাবে স্বীকার করেন যে, এই বিচার ছিল একটি বড় ভুল এবং জুরিরা ছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি বেঁচে থাকা বাকি তিনজনকে (ফিল্ডেন, শোয়াব এবং নিবে) জেল থেকে মুক্তি দেন।
এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’-এর প্রথম কংগ্রেসে ফরাসি প্রতিনিধি রে মঁ লােভিনে প্রস্তাব দেন, ১৮৯০ সাল থেকে পয়লা মে দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হোক, যাতে শিকাগোর শ্রমিকদের স্মরণ করা হয় এবং ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আরও জোরালো করা হয়। এই প্রস্তাবের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী এই দিনটি পালন হতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘও মে মাসের এক তারিখকে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে। কিন্তু আমেরিকায় এই ঘটনাটির সূত্রপাত হলেও আমেরিকাতে মে দিবস হিসেবে নয় বরং তাদের নিজস্ব ‘লেবার ডে’ হিসেবে দিনটি পালন করা হয়।
ভারতে ১৯২৩ সালে ১লা মে মাদ্রাজে প্রথম মে দিবস পালন করা হয়। এই ঐতিহাসিক দিনটি পালনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মালয়া পুরম সিঙ্গারভেলু চেটিয়ার। লোকমুখে শোনা যায় শ্রমিকদের এই দিনটিতে লাল পতাকা ওড়ানোর জন্য পাশে কোন লাল কাপড় না থাকায় উনি নাকি তাঁর মেয়ের লাল শাড়ির কিছু অংশ ছিঁড়ে পতাকা বানিয়ে উড়িয়ে ছিলেন, আর সেটাই ছিল কমিউনিজমের প্রথম লাল ঝান্ডা যেটি ভারতের মাটিতে উত্তোলিত হয়।লাল ঝাণ্ডা ওড়ানোর সময় সিঙ্গারভেলু বলেছিলেন, শ্রমিকদের মুক্তি ছাড়া ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা সম্ভব নয়, এবং সেই দিনই তিনি প্রতিষ্ঠিত করে “দি লেবার কিষান পার্টি অফ হিন্দুস্তান”।
শিকাগোর সেই রক্তঝরা সংগ্রামের প্রায় দেড়শ বছর পর আজও শ্রমিকরা পূর্ণ মুক্তি পায়নি। বরং শোষণের ধরণ বদলেছে। একদিকে প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়ন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তা এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ,ভারতে ৪৪টি কেন্দ্রীয় শ্রম আইনকে বাতিল করে মাত্র ৪টি ‘লেবার কোড’ (Labour Code)-এ নিয়ে আসা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি অনুযায়ী, কাজের সময় ৮ ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মালিকপক্ষ তাদের ইচ্ছেমত শ্রমিকদেরকে কাছ থেকে ছাঁটাই করে যা আগেকার সময় অনেক বেশি কঠিন ছিল।
এছাড়াও বর্তমানে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন অনলাইন খাবার ডেলিভারি বা দৈনন্দিন জরুরি জিনিস, ১০ মিনিট ডেলিভারি অ্যাপ যেমন জোম্যাটো, ফ্লিপকার্ট, ব্লিঙ্ক-ইট শুরু হয়েছে। এর ফলে এইসব ডেলিভারি পার্টনার বা এজেন্ডরা কোন স্থায়ী বেতন পান না। এবং পিএফ (PF), গ্র্যাচুইটি বা বিমার মতো কোনো সামাজিক সুরক্ষা তারা পান না।
হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও আইনিভাবে তারা ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য হন না বলে তাদের অধিকার আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়াও এখন বিভিন্ন কলকারখানা বা কোম্পানিতে স্থায়ীভাবে কাজের বদলে চুক্তিভিত্তিক বা কন্ট্রাকচুয়াল ( contractual) কাজ ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে শ্রমিকদের মনে কাজ হারানোর ভয় থাকে।
এছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্তমান বাজারে জিনিসপত্রের দামের বৃদ্ধি। রোজকারের আয়ের পরিমাণ এতটাই ন্যূনতম হয় যে একজন শ্রমিক তার পরিবারকে স্বাস্থ্যকর এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার ও শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হন। এছাড়াও রোগব্যাধিতে তারা ডাক্তার দেখাতেও সক্ষম হয়ে থাকেন না।
এখন প্রশ্ন হল মে দিবস পালনের পরেও আমরা কি শ্রমিকদের সঠিক সম্মান ও মর্যাদা দিতে পেরেছি? শিকাগো সেই আট ঘন্টা কাজের দাবি নিয়ে যে লড়াই শহীদরা লড়েছিলেন তা আজ কর্পোরেট লাক্সারির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে মে দিবস কেবলমাত্রই একটি উদযাপনের দিন নয় বরং শ্রমিকদেরকে তাদের মর্যাদা এবং স্বীকৃতি দেওয়ার দিন।


Recent Comments