ভারতীয় সংবিধানের কথা উঠলেই প্রথমেই মনে পড়ে বাবা সাহেব আম্বেদকরের নাম। ইতিহাস তাঁকে যথার্থভাবেই প্রধান স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত নথি রূপ পাওয়ার আগে, যে মানুষটি প্রথম সম্পূর্ণ কাঠামোটি নির্মাণ করেছিলেন— তিনি প্রায় অদৃশ্য থেকে গেছেন জনস্মৃতিতে। সেই মানুষটি স্যার বেনেগাল নারসিং রাউ।
মেধার প্রথম পরিচয়
১৮৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ম্যাঙ্গালোরে জন্ম। প্রেসিডেন্সি কলেজ, মাদ্রাজ থেকে অসাধারণ ফল করে কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে পাড়ি। সেখানে সহপাঠী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু। নেহরু বাড়িতে চিঠি লিখে রাউয়ের সম্পর্কে বর্ণনা করেছিলেন “frightfully clever”— এমন এক ছাত্র, যিনি সর্বক্ষণ অধ্যয়নে নিমগ্ন।
১৯১০ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে রাউ আইন ও প্রশাসনের জটিল গঠন গভীরভাবে বুঝতে শেখেন। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের পর বিশাল আইনি কাঠামো পুনর্গঠনের দায়িত্ব তিনি দু’বছরেরও কম সময়ে সম্পন্ন করেন। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে।
সংবিধানের প্রথম খসড়া
১৯৪৭— স্বাধীনতা এল, কিন্তু কাঠামো অনুপস্থিত। ২৯ আগস্ট গণপরিষদের সাংবিধানিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হলেন রাউ। তিনি সদস্য না হয়েও এমন এক কাজ করলেন, যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
মাত্র আট সপ্তাহে ২৪০ অনুচ্ছেদ ও ১৩ তফসিল সম্বলিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করেন তিনি। এই খসড়াই পরে খসড়া প্রণয়ন কমিটির ভিত্তি হয়। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন আম্বেদকর, যিনি নথিটিকে চূড়ান্ত রূপ দেন— কিন্তু ভিত গেঁথে দিয়েছিলেন রাউ।
ভাবনার গভীরতা: অধিকার ও ভারসাম্য
রাউ বিশ্বাস করতেন, অধিকার কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি নয়— তা কার্যকর হতে হবে। নাগরিকের সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার অধিকার তাঁরই প্রস্তাব, যা পরবর্তীতে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে স্থান পায়। আম্বেদকর একে বলেছিলেন “সংবিধানের হৃদয়।”
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাউয়ের ছাপ স্পষ্ট। প্রথম খসড়ায় ছিল “due process of law”। যুক্তরাষ্ট্র সফরে বিচারপতি ফেলিক্স ফ্র্যাঙ্কফার্টারের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি বুঝলেন, এই শব্দবন্ধ আদালতকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিতে পারে। তাঁর প্রস্তাবেই বদলে আসে “procedure established by law”— যা সংসদ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে।
বিশ্বমঞ্চে এক ভারতীয়
সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর রাউ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখেন। তিনি রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং পরে ‘দ্য হেগে’ আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারপতি হন। বিশ্ব আইনের উচ্চতম মঞ্চেও তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বীকৃত।
নীরবতার আড়ালে
১৯৫৩ সালে তাঁর প্রয়াণ ঘটে। জনস্মৃতিতে তিনি ততটা উজ্জ্বল নন, যতটা হওয়া উচিত ছিল। ইতিহাসবিদরা অবশ্য তাঁর গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। কিন্তু জনপ্রিয় আলোচনায় তিনি থেকে গেছেন নেপথ্যে।
আজ, যখন সংবিধান নিয়ে আলোচনা হয়, তখন স্যার বেনেগাল নারসিং রাউয়ের নাম স্মরণ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো নয়— বরং সেই নীরব বুদ্ধিমত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা স্বাধীন ভারতের আইনি ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

